কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব রংপুর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদফতরের নির্দেশনায় এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জিল্লুর রহমান সোমবার (১২ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে মামলার সব কাগজপত্র রংপুর পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সাইফুজ্জামান ফারুকি।
এ বিষয়ে রংপুর পিবিআই পুলিশ সুপার জাকির হোসেন জানান, পুলিশ সদরদফতরের নির্দেশে মামলাটি রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানা থেকে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন মামলার তদন্ত করবে পিবিআই।
এদিকে, দীর্ঘ ২৭ দিনেও সাঈদের হত্যাকারী পুলিশ ও হুকুমদাতাদের কাউকেই গ্রেফতার না করায় তীব্র ক্ষোভ পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
যেভাবে হত্যা করা করা হয় সাঈদকে
গত ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্কের মোড় থেকে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় বেরোবির ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে টার্গেট করে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশি-বিদেশি অসংখ্য গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এতে দেখা যায়, হাতে একটা গাছের ছোট ডাল হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিলেন সাঈদ। বার বার তার দুই হাত প্রসারিত করে বুক আগলে দেন। ওই সময় তার পেছনে কেউ ছিলেন না। পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে অসংখ্য টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে। গুলি এসে বিঁধে আবু সাঈদের প্রসারিত করে রাখা বুকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে রিকশায় পরে অটোরিকশায় করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পাল্টে দেয় হত্যার স্থান
১৬ জুলাই রাত সাড়ে ৯ টায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও মেট্রোপলিটন তাজহাট থানার এসআই বিভূতি ভূষণ রায় বাদী হয়ে তাজহাট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারের আসামির কলামে কারও নাম উল্লেখ না করলেও অজ্ঞাত ২/৩ হাজার জন ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তসহ বিএনপি ও জামায়াত-শিবির সমর্থিত নেতাকর্মী উল্লেখ করা হয়। ঘটনাস্থল দেখানো হয় বিশ্ববিদ্যালয় রংপুরের ১ নম্বর গেটের সামনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বিভিন্ন স্থান ও ভবন এবং ভিসির বাংলোর ভেতরে।
অথচ আবু সাঈদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে পুলিশ গুলি করে হত্যা করলেও ঘটনার স্থান দুটি দেখিয়ে অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালায়।
মামলার এজাহারে পুলিশ যা বললো
মামলার এজাহারে বাদী এসআই বিভূতি ভূষণ রায় উল্লেখ করেন, ১৬ জুলাই তিনি বেরোবির ১ নম্বর গেটের সামনে ডিউটিরত ছিলেন। দুপুর অনুমান ১টার দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য রংপুর মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৪/৫ হাজার শিক্ষার্থী শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হওয়ার জন্য রওনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা ছাত্রলীগ শাখার অসংখ্য নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে যেন সংঘর্ষে লিপ্ত না হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটে মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুর রহমান, সহকারী কমিশনার (পশুরাম জোন) ইমরান হোসেন, তাজহাট থানার ওসি রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে এসআই, এএসআই, কনস্টেবলসহ অন্যরা ডিউটিতে ছিলেন।
দুপুর দেড়টার দিকে আন্দোলনকারীরা জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী নিয়ে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে লাঠিসোঁটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের দিকে অগ্রসর হয়ে ১ নম্বর গেটের কাছে এসে করে জোর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডিসহ অন্যরা তাদের বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও প্রবেশের চেষ্টা করে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। উত্তেজিত জনতাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এ এস আই মিজান তার গ্যাস গান থেকে ৪৫টি শেল, কনস্টেবল হান্নানের গান থেকে ২৫টি শেল নিক্ষেপ করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নিরাপত্তার জন্য এসআই, এএসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তারা রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি বর্ষণ করে।
তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ১৩৯ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীদের ছোড়া গুলি ও ইটপাটকেলে এক পর্যায়ে এক শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখা যায়। তার সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত ছাত্রের নাম আবু সাঈদ, পিতা মকবুল হোসেন। ঠিকানা জাফরপাড়া বাবনপুর বলে মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা যায়।
এজাহারে দুই সহকারী পুলিশ কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এই অভিযোগে দণ্ডবিধি আইনের ১৪৩/১৮৬/ ৩৩২/৩৩৩/৩৫৩/ ৩৭৯/ ৪৩৫/ ৪২৭/৩০২/৩৪ ধারা উল্লেখ করে পুলিশ। পুলিশের করা মামলার এজাহারের সঙ্গে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনার বাস্তব দৃশের কোনও মিল নেই।
পুলিশের করা মামলার এজাহারে আবু সাঈদ বিএনপি, জামায়াত-শিবির ও কোটা নিয়ে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের গোলাগুলি ও ইটপাটকেলের আঘাতে মারা যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা গেছে, ইটপাটকেলের আঘাতে নয়, আবু সাঈদ একাই দাঁড়িয়ে বার বার বুক পেতে দিচ্ছিলেন, তার ডানে বাঁয়ে কেউ নেই। পুলিশ তাকে টার্গেট করে গুলি করছে। এরপর পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং বুকসহ সারা শরীরে অসংখ্য গুলির চিহ্ন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার তদন্ত পিবিআইকে দেওয়ার বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার সাইফুজ্জামান ফারুকি সোমবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুলিশের করা হত্যা মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। পিবিআই তদন্তকালে যাকেই আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রমাণ পাবে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সাঈদ হত্যার ভিডিওসহ সব প্রমাণাদি অবশ্যই পিবিআই খতিয়ে দেখবে। এ ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে দীর্ঘ ২৭ দিনেও ছেলের হত্যাকারীদের গ্রেফতার না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহত সাইদের বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম। একই ক্ষোভ বেরোবির শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ, অধ্যাপক ড. মতিউর রহমানসহ শিক্ষার্থীদেরও।









