বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মোহাম্মদ আলী (১৮) নামে এক যুবককে গুলি করে আহতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এই মামলায় লালমনিরহাটের এক সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। অথচ মামলায় কাকে কাকে আসামি করা হয়েছে, তা জানেন না বাদী।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলার আবেদন করেন মোহাম্মদ আলীর বাবা মমিন মিয়া। সোমবার (০৯ সেপ্টেম্বর) অভিযোগটি গ্রহণ করে এফআইআর হিসেবে নেওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আহত মোহাম্মদ আলী আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের রশিদবাগ গ্রামের মমিন মিয়ার ছেলে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রেস ব্রিফিংয়ে ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে সারা দেশে রাজপথে থাকবে আওয়ামী লীগ। সরকারের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য পরদিন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এমপিদের নেতাকর্মীকে ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী লালমনিরহাট থেকে ৮-১০টি বাসে এবং বিভিন্ন
যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঢাকায় গিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর কর্মসূচিতে যোগ দেন। ৫ আগস্ট সকাল ৯টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেয় মোহাম্মদ আলী। যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়তের সামনের সড়কে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ তাকে গুলি করে। এতে আহত হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ১৩ আগস্ট মোহাম্মদ আলী সুস্থ হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় মামলা করতে দেরি হয়েছে।
এই মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বাংলা ট্রিবিউনের লালমনিরহাট প্রতিনিধি ফারুক আলমকে ৮০ নম্বর আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার বাদী মমিন মিয়া বলেন, ‘মামলাটি আমি করেছি ঠিক। তবে অনেকের সঙ্গে কথা বলে আসামিদের তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় কার কার নাম আছে, ঠিক আমি জানি। এই মামলায় আপনার নাম থাকার কথা নয়।’ আসামিদের তালিকা কে করে দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকের সঙ্গে পরামর্শ করে করা হয়েছে। বিষয়টি আমার ভায়রা জানেন।’
এ ব্যাপারে মমিন মিয়ার ভায়রা এই মামলার সাক্ষী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আপনার নাম কীভাবে এজাহারে ঢুকলো, তা বলতে পারছি না। যদি নাম থেকেই থাকে তাহলে আমরা দুঃখপ্রকাশ করছি। এখনও আসামিদের তালিকা আমি দেখিনি। দেখার পর এটি সংশোধন করা যাবে। আদালত থানাকে এফআইআরভুক্ত করতে বলেছেন। পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দেবে। তখন কে কে অভিযুক্ত, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাদাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রনির যোগসাজশে মামলার এজাহার তৈরি করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমার কাছে একজন মামলার কপিটি পাঠিয়েছেন। এতে কাকে কাকে আসামি করা হয়েছে, তা জানি না। এজাহার দেখার পর বলতে পারবো।’
এই মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিক ফারুক আলম বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি লালমনিরহাট জেলায় কর্মরত ছিলাম। তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ছিল জেলা শহর। সংবাদ সংগ্রহের জন্য ছাত্র সমন্বয়ক, বিএনপির নেতাকর্মী, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠে ছিলাম। জেলার সব মহলের লোকজন বিষয়টি জানেন। সেদিনকার জেলা শহর ও সরকারি দফতরের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলে প্রমাণ পাওয়া যাবে আমি লালমনিরহাটে ছিলাম। জেলার বাইরে যাওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। অথচ আমাকে যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় মামলার আসামি করা হয়েছে। এই মামলার প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
লালমনিরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি মোফাকখারুল ইসলাম মজনু বলেন, ‘কারা এসব মামলা করছে, কীভাবে হচ্ছে; তা খুঁজে বের করতে হবে। সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করলে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। যার তার নামে ইচ্ছে মতো মামলা দেওয়া হয়রানি ছাড়া কিছুই নয়। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’









