৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য, শহীদ হন ৯৯ বীর মুক্তিযোদ্ধা

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫

আজ (৬ ডিসেম্বর) কুড়িগ্রাম হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে কুড়িগ্রামকে হানাদারমুক্ত করেন। দেশজুড়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও এদিন কুড়িগ্রামে উদিত হয় স্বাধীনতার সূর্য। জেলার সূর্যসন্তান কোম্পানি কমান্ডার বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকারের হাত ধরে মুক্ত বাতাসে ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা।

মুক্তিবাহিনীর কে ওয়ান, এফএফ কোম্পানি কমান্ডার বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল এদিন বিকাল ৪টায় কুড়িগ্রাম শহরে প্রথম প্রবেশ করেন। তারা নতুন শহরের ওভার হেড পানির ট্যাংকের ওপরে (বর্তমান সদর থানার উত্তরে অবস্থিত) স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেন বিজয়বার্তা। সেদিন বিজয় মিছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাগত জানাতে হাজারো মুক্তিকামী মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। ২৩০ দিন পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে মুক্ত হয় ব্রহ্মপুত্র-ধরলা-তিস্তা বিধৌত উত্তরের জনপদ কুড়িগ্রাম।

জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালে কুড়িগ্রাম জেলা ছিল ৮টি থানা নিয়ে গঠিত একটি মহকুমা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জেলার অর্ধেক অংশ ছিল ৬ নং সেক্টর এবং বাকি অংশ ছিল ১১ নং সেক্টরের অধীনে। ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন  রৌমারী ছিল মুক্তাঞ্চল। সেখানেই চলতো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ।

১৯৭১ সালের ১০ মার্চ মহকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ১৭ মার্চ স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা চিলড্রেন পার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে মানচিত্র আঁকা স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। ২৫ মার্চের কালো রাতের পর সংগ্রাম কমিটি ২৮ মার্চ শহরের গহর পার্ক (বর্তমানে মজিদা কলেজ মাঠ) ময়দানে জনসভা করার পর বেসরকারি হাইকমান্ড গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। ৩০ মার্চ রংপুরস্থ ইপিআর উইং-এর সহকারী অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিন কিছু সঙ্গী-সাথী নিয়ে কুড়িগ্রামে চলে আসেন। তারই নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ১ এপ্রিল থেকে তিস্তা নদীর পূর্বপাড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী দালালদের সহযোগিতায় তিস্তা নদী পার হয়ে লালমানিরহাট দখল করে নেয়। হানাদাররা ৭ এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে বর্তমান সার্কিট হাউজের সামনে অবস্থান নেয় এবং তৎকালীন কুড়িগ্রাম উপ-কারাগারে (বর্তমানে জেলা কারাাগার) অতর্কিতভাবে হানা দিয়ে কারাগারের ইনচার্জ শেখ হেদায়েত উল্লাহসহ পাঁচ জন কারারক্ষীকে সার্কিট হাউজের সামনে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ২০ এপ্রিল হানাদার বাহিনী পুরো শহর দখল করে নেয়।

এরপর থেকে দেশকে মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হতে থাকেন। জুলাই মাস থেকে শুরু করেন গেরিলা যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করতে থাকে একের পর এক সফল অভিযান। 

১৩ নভেম্বর উলিপুরের হাতিয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী নৃশংস গণহত্যা চালায়। এদিন পাকবাহিনী ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা (প্লাটুন কমান্ডার হীতেন্দ্র নাথ, শহীদ গোলজার, শহীদ কাচু, শহীদ নজির হোসেন ও শহীদ নজরুল ইসলাম) সহ সাত শতাধিক নিরীহ মানুষকে দাগারকুটি বধ্যভূমিতে জড়ো করে হত্যা করে। ১৪ নভেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে ভূরুঙ্গামারী, ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী, ৩০ নভেম্বর সমগ্র উত্তর ধরলা এবং ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরসহ সমগ্র জেলা হানাদারমুক্ত করে। এদিন দুপুর নাগাদ ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম ত্যাগ করে হানাদার বাহিনী। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কুড়িগ্রামকে হানাদার মুক্ত করতে শহীদ হন ৯৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

যুদ্ধকালীন প্রায় অর্ধশতাধিক অপারেশনে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুড়িগ্রামে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনে নেতৃত্বদানকারী কে ওয়ান, এফ এফ কোম্পানি কমান্ডার বীর প্রতীক আব্দুল হাই সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এখনও পূরণ হয়নি। আমরা যুদ্ধ করেছি জাতির মুক্তির আশায়, প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদের জন্য। এসব বাস্তবায়ন হলে মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বাধীনতার এত বছরেও তা প্রতিষ্ঠিত হলো না।’

‘জুলাই আন্দোলন হলো, বিপ্লব হলো কিন্তু বিপ্লবী সরকার হলো না। বাহাত্তরের সংবিধানেই তারা শপথ নিলেন। জুলাই সনদও বাস্তবায়ন হলো না। তাহলে হলো কোনটা? লুটপাট বাস্তবায়ন হচ্ছে। এখন তো মবের মুল্লুক হয়েছে, মব সন্ত্রাস হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও কর্মসূচি নেই। সবাই শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে। জনগণের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য কেউ নাই। স্বাধীনতার চেতনা নাই, জুলাই আন্দোলনের বৈষম্যবিরোধী চেতনাও নাই। সবাই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত।’ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন খেতাবপ্রাপ্ত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কুড়িগ্রাম জেলা ও সদর উপজেলা ইউনিট কমান্ড, প্রচ্ছদ, সাম্প্রতিক কুড়িগ্রাম, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, হিজিবিজি, প্রীতিলতা ব্রিগেডসহ কয়েকটি সংগঠন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শনিবার বিজয় র‌্যালি বের হয়ে শহরের কলেজ মোড়ের বিজয় স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ অনুষ্ঠিত হবে। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতায় এতে জেলার মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেবেন।

/এএম/এস/
সম্পর্কিত
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
নোয়াখালীতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনমুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করলে গণঅভ্যুত্থান হবে, রাজাকারদের পাকিস্তানে পাঠানো হবে
মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ
সর্বশেষ খবর
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
হবিগঞ্জে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
বগুড়ায় দই বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনলেন ব্যবসায়ী 
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
৩৮ বছর বাড়ি ফিরে বিপদে জবেদ, স্ত্রী বললেন স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি