রংপুরের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে হাঁড়িভাঙা আম। সারা দেশে রয়েছে খ্যাতি। চাহিদাও বেশ। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। একসময় মিঠাপুকুর উপজেলায় এই আমের ফলন হলেও এখন জেলার বিভিন্ন স্থানে হয়। আম চাষে অনেকের ভাগ্য বদলে গেছে। হয়েছেন স্বাবলম্বী। এবার ২০০ কোটি টাকার আম বিক্রির আশা করা হচ্ছে। তবে রংপুরের বিখ্যাত ও সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আমের নামকরণের বিষয়টি অনেকের অজানা। এর পেছনে একটি মজার ঐতিহাসিক গল্প রয়েছে। শুরুতে এই আমের নাম ছিল ‘মালদিয়া’।
হাঁড়িভাঙার যাত্রা
কৃষি কর্মকর্তা ও স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিঠাপুকুর উপজেলার তেকানী গ্রাম থেকে হাঁড়িভাঙার যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই গ্রামেই রোপণ করা একটি গাছের কলম থেকে এখন কয়েক লাখ আমগাছ হয়েছে। বদলে গেছে গ্রামের দৃশ্যপটও। এখন রংপুরের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে এই আম।
শুরুতে হাঁড়িভাঙা নয়, মালদিয়া ছিল নাম। মালদিয়ার নাম হাঁড়িভাঙা হয়ে ওঠার গল্প জানা গেলো তেকানী গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন পাইকারের কাছে। তার বাবা নফল উদ্দিন পাইকারকে সবাই বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেই চিনতেন। তেকানী গ্রামে এখনও দাঁড়িয়ে থাকা হাঁড়িভাঙার মাতৃগাছটি রোপণ করেন নফল উদ্দিন।
আমজাদ হোসেন পাইকার জানান, ১৯৪৯ সালে মিঠাপুকুরের উঁচা বালুয়া গ্রামটি ছিল ঝোপজঙ্গলে ভরপুর। সেই এলাকার জমি থেকে একটি আমের চারা নিয়ে এসে কলম করেন তার বাবা নফল উদ্দিন। তখন এর নাম ছিল মালদিয়া। আমগাছটিতে মাটির হাঁড়ি বেঁধে ফিল্টার বানিয়ে পানি দেওয়া হতো। একদিন রাতে কে বা কারা মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। তবে গাছে বিপুল পরিমাণ আম ধরে। সেগুলো ছিল খুবই সুস্বাদু। বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে গেলে মানুষ ওই আম সম্পর্কে জানতে চায়। তখন নফল উদ্দিন মানুষকে বলেছিলেন, যে গাছে লাগানো হাঁড়িটি মানুষ ভেঙে ফেলেছে, সেই হাঁড়িভাঙা গাছের আম এগুলো। তখন থেকেই ওই গাছটির আম ‘হাঁড়িভাঙা’ নামে পরিচিতি পায়।
আমজাদ হোসেন পাইকার বলেন, ‘সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় সেই মাতৃগাছ থেকে জোড়া কলম করার হিড়িক পড়ে যায়। এলাকার মানুষ জোড়া কলম নিয়ে লাগাতে থাকেন। এতে গড়ে উঠতে থাকে বাগান। নফল উদ্দিন পাইকার মারা যাওয়ার পর হাঁড়িভাঙার মাতৃগাছে মানুষ এসে এত জোড়া কলম করতে লাগলেন যে গাছটির ডালগুলো হেলে পড়া শুরু করলো। এরপর আশির দশকে বাণিজ্যিকভাবে গাছের কলম করে মানুষজন আমবাগান গড়ে তুলতে নেমে পড়েন। মূলত হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন আমার বাবা।’
হাঁড়িভাঙার বৈশিষ্ট্য
এর বৈশিষ্ট্য হলো আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। ছাল খুব পাতলা এবং আঁটি ছোট। প্রতিটির ওজন ১৫০-৩০০ গ্রাম হয়। ভেতরে কোনও আঁশ থাকে না। শাঁসটি মাখনের মতো নরম ও মিষ্টি হয়। আঁটি অত্যন্ত ছোট হয় এবং খোসা খুবই পাতলা থাকে। ফলে আমের খাওয়ার যোগ্য অংশ বা শাঁস বেশি পাওয়া যায়। এটি খেতে অত্যন্ত মিষ্টি এবং এর রয়েছে চমৎকার সুগন্ধ, যা আমপ্রেমীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। এতে কোনও রকম কৃত্রিম রাসায়নিক বা কার্বাইড ব্যবহার করে পাকানো হয় না, প্রাকৃতিকভাবেই গাছে বা ঘরে পাকে। রংপুর, বিশেষ করে মিঠাপুকুর অঞ্চলের মাটির গুণে এর স্বাদ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আম থেকে ভিন্ন ও অনন্য হয়। ইতিমধ্যে এটি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এসব কারণে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
যেভাবে সুনাম ছড়িয়ে পড়লো
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৩৫ বছর আগে থেকে বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা চাষ হচ্ছে। শুরুতে তেমন একটা প্রচার ছিল না। তবে গত ২৫ বছর থেকে ধীরে ধীরে প্রচার পেতে থাকে। মিঠাপুকুরের পর বদরগঞ্জ উপজেলায় চাষ শুরু হয়। বদরগঞ্জের পদাগঞ্জ এলাকায় প্রথমে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন আব্দুস সালাম। তার সফলতা দেখে এলাকার মানুষ চাষ শুরু করে। এই এলাকার মাটি লাল ও কাদাযুক্ত হওয়ায় বছরে একবার ধান ছাড়া কোনও ফসল হতো না। সে কারণে এলাকার সবাই হাঁড়িভাঙা চাষ শুরু করেন। পরে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
এরপর গোপালপুর, পীরগঞ্জ ও সদর উপজেলার লাল মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়। বিশেষ করে বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, পদাগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুস্করনী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি, রানীপুকুর ও বলদিপুকুর এলাকার প্রায় সব গ্রামে হাঁড়িভাঙার বাগান আছে। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এসব বাগান। এর মধ্যে বিশেষ করে বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে এই আম চাষ। এসব গ্রামের হাজার হাজার পরিবার আম বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী।
চাষে খরচ কেমন, আয় কত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, হাঁড়িভাঙা আম রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমটি দেশে-বিদেশে খ্যাতি পেয়েছে। এখনও বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, হেক্টরপ্রতি আম ফলনে ব্যয় হয় ২৮-৩০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতি হেক্টর জমি বর্গা নিতে ব্যয় ২০-২৫ হাজার টাকা। প্রতি হেক্টরে উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। হেক্টরে ৩০০-৩২৫ মণ উৎপাদন হয়। বর্তমান আমের মণপ্রতি বাজার দর অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। প্রতি হেক্টরের আম বিক্রি থেকে চাষিদের আয় হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ টাকার ওপরে।
এবার ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রির আশা
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ১৮ লাখের অধিক হাঁড়িভাঙা আমগাছ রয়েছে। চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০০ হেক্টর বেশি। তা থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে। ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙা বাজারজাত করার সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে যেসব এলাকায় আগে পাকবে ১৫ জুন থেকে পাড়া যাবে।’









