রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত একটি বাস মেরামতে ২৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইভাবে পুরোনো একটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের নামে আরও দুই লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও মেরামতের পর সেটি একদিনের জন্যও চলাচল করেনি।
বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবহন পুলের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠিও দিয়েছেন তারা।
বাস মেরামতে ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতর সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি বাস বিকল হলে সেটি মেরামতের জন্য ‘ফ্রেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। মেরামত শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বাসটি মেরামতের জন্য পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেরামতের নামে বাসটির বাইরে রং করা এবং ইঞ্জিনে কিছু কাজ করেই বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। এমনকি ব্যয়ের একটি অংশ পরিবহন পুলের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে দুই লাখ, চলেনি একদিনও
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে কেনা একটি পুরোনো অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের জন্য দুই লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু মেরামতের পর সেটি একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি; এখনও গ্যারেজে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ।
শিক্ষার্থীদের দাবি, অল্প কিছু কাজ করে বাকি অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ভাগ-বাঁটোয়ারা করেছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা পরিবহন পুলের কর্মকাণ্ড তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
২৮ লাখে নতুন বাস কেনা যেতো
শিক্ষার্থীদের পরিবহন করা একটি বাসে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী। তারা বলেন, ২৮ লাখের সঙ্গে আরও কিছু টাকায় যুক্ত করলে একটি নতুন বাস পাওয়া যায়, সেখানে মাত্র এক বাসে মেরামতে কীভাবে এত টাকা ব্যয় হলো, তা আমাদের জানা নেই। বাসে কী কী কাজ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করা উচিত। আমরাও বিষয়টি জানতে চাই।
অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদুল হক আলবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সংকটের পাশাপাশি দুর্নীতির তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি, বেরোবিতে একটি বাস মেরামতে ২৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বাস মেরামতে এত টাকা ব্যয় আমাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। স্বাভাবিকভাবে একটি বাস মেরামতে এত টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে আমরা মনে করি না। সুতরাং এখানে দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেরামতেই যদি এত টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে এর সঙ্গে আরও কিছু টাকা যোগ করে নতুন বাস কেনা সম্ভব ছিল। সুতরাং পরিবহন মেরামতের মতো বিষয়ে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।’
একই অভিযোগ করেছেন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদাসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তারা পরিবহন পুলকে ‘নৈরাজ্য ও অর্থ লোপাটের কারখানা’ বলেও অভিযোগ করেছেন।
খাতভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব নেই
এদিকে বাস মেরামতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য জানাজানির পর লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের পরিচালক ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ রানা।
১৪ আগস্ট পরিবহন পুল নিয়ন্ত্রিত একটি ফেসবুক গ্রুপে দেওয়া ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পরিবহন শেডের বাইরে পড়ে ছিল। এর মধ্যে একটি বাস মেরামতযোগ্য হওয়ায় সেটির বডি, ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় অংশ সম্পূর্ণভাবে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে তার দেওয়া ব্যাখ্যায় ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা কোন কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে, তার কোনও খাতভিত্তিক হিসাব দেওয়া হয়নি। শুধু বডি, ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন অংশ পুনর্নির্মাণের কথা উল্লেখ করে মেরামতের প্রক্রিয়া ও দরপত্রের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে ব্যয়ের বিপরীতে মেরামতের কাজের পরিমাণ ও অর্থের যৌক্তিকতা যাচাই করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ব্যাখ্যা না দিয়ে পরিবহন পুল পরিচালকের নিয়ন্ত্রিত ফেসবুক গ্রুপে বিষয়টি প্রকাশ করা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নতুন বাস ৫৫ লাখ টাকার নিচে পাওয়া যায় না
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের পরিচালক মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন বাস ৫৫ লাখ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। আর এই বাসের সম্পূর্ণ বডি ঠিক করা হয়েছে। যার কারণে এত টাকা খরচ হয়েছে।’
মেরামতের কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কাজটি কমিটির মাধ্যমে হয়েছে। উপাচার্য স্যার কমিটি করে দিয়েছেন। কমিটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়। এরপর যারা সর্বনিম্ন দরপত্র দিয়েছে, তাদেরই কাজটি দেওয়া হয়েছে।’
উপাচার্যের বক্তব্য
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিবহন পুলে যোগাযোগ করতে বলেন।
বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ এবং এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—মেরামতের কাজে প্রকৃতপক্ষে কী কী করা হয়েছে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি, স্বচ্ছতার স্বার্থে দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার ও কাজের খাতভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।









