রংপুরসহ বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন বাজারে পদ্মার ইলিশের নামে বেশি দামে অন্য স্থানের মাছ বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের একটি চক্র চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ইলিশকে চাঁদপুর, পদ্মা, বরিশাল ও পিরোজপুরের ইলিশ বলে বেশি দামে বিক্রি করে ক্রেতাদের প্রতারিত করছে। বিশেষ ধরনের বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহার করে মাছকে উজ্জ্বল ও সতেজ দেখিয়েও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদেরই একাংশের।
রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি মাছের আড়ত সিটি বাজারে সরেজমিনে তিন দিন ঘুরে মাছ ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
মাছ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক বছরে চাঁদপুর বা পদ্মার ইলিশের কোনও চালান সিটি বাজারে আসেনি। এরপরও কয়েকজন ব্যবসায়ী চাঁদপুর ও পদ্মার ইলিশের কথা বলে কেজিপ্রতি ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দরে ইলিশ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে, কিছু আড়তদার বরিশাল ও পিরোজপুরের ইলিশ বলে কেজিপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে মাছ বিক্রি করছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পদ্মা বা বরিশালের ইলিশের কথা বলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে মাছের দোকানে শক্তিশালী সাদা ও লাল রঙের বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব আলোতে মাছের মাথার দিক লালচে ও পুরো মাছ উজ্জ্বল দেখায়। ফলে তুলনামূলক নিম্নমানের মাছকেও সতেজ ও আকর্ষণীয় দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
ভারতীয় ইলিশ বিক্রি বন্ধ রেখেছি
সিটি বাজারের ইলিশ মাছ ব্যবসায়ী সাহেব আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১০ দিন আগেও বাজারে ভারতীয় ইলিশ বিক্রি করা হতো। তবে ওই ইলিশ কিনে অনেক ক্রেতা স্বাদ নিয়ে আপত্তি করায় ভারতীয় ইলিশ বিক্রি বন্ধ রেখেছি।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাজারে বর্তমানে যে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর সবই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের। সমুদ্রের লোনা পানি থেকে সংগ্রহ করার কারণে এসব মাছের স্বাদ তুলনামূলক কম। চাঁদপুর ও পদ্মার ইলিশের নামে যারা মাছ বিক্রি করছেন, তারা ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন।’
তিন ধরনের ইলিশ বিক্রি
ইলিশ মাছ ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন ধর জানান, তিনি তিন ধরনের ইলিশ বিক্রি করেন। এর মধ্যে এক কেজি ওজনের চাঁদপুরের পদ্মার ইলিশ কেজিপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা, বরিশাল ও পিরোজপুরের ইলিশ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং চট্টগ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকার কম দামে বিক্রি করছেন।
তিনি দাবি করেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ইলিশ একই ধরনের। তবে কক্সবাজারের মাছ লবণাক্ত পানির হওয়ায় স্বাদ ভালো হয় না।
দেখে বোঝার উপায় নেই কোন এলাকার ইলিশ
ইলিশ মাছ ব্যবসায়ী আখতার হোসেন, আবুল কাশেম, রবিউল ইসলাম, সোনা রায়সহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ইলিশ মাছ দেখে নিশ্চিত হওয়ার কোনও উপায় নেই কোনটি চাঁদপুর বা পদ্মার, কোনটি বরিশাল বা পিরোজপুরের এবং কোনটি চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের।
তাদের ভাষ্য, মূলত ব্যবসায়ীদের ওপর বিশ্বাস রেখেই ক্রেতারা ইলিশ কেনেন। তবে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত তথ্য জানালে অনেক ক্রেতা বিশ্বাস করতে চান না, এমনকি মাছও কিনতে চান না। অন্যদিকে, যেসব ক্রেতা নিয়মিত তাদের কাছ থেকে মাছ কেনেন, তাদের কাছে মাছের প্রকৃত উৎস জানিয়ে বিক্রি করা হয়।
প্রতিটি ইলিশের দোকানে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা সুনির্দিষ্ট কোনও উত্তর দিতে পারেননি।
একজন ব্যবসায়ী জানান, কয়েক দিন আগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা শক্তিশালী বাল্ব ও লাল রঙের বাল্ব ব্যবহার না করতে তাদের নিষেধ করে গেছেন।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘পাওয়ারফুল বাল্ব আর লাল রঙের লাইট জ্বালানো হয় মূলত ইলিশ মাছকে তরতাজা, উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য। এতে নিম্নমানের মাছকেও ভালো ও তরতাজা দেখানো যায়।’
ক্রেতারা বলছেন প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছি
নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার সরকারি চাকরিজীবী আবদুল্লাহ আল মারুফ ইলিশ কিনতে এসে বলেন, ‘আমরা তো চিনি না কোনটা চাঁদপুর বা পদ্মার, কোনটা বরিশালের আর কোনটা চট্টগ্রামের। এটা কোনোভাবেই চিহ্নিত করা সম্ভব না। তবে বাসায় নিয়ে রান্না করার পর খেতে গিয়ে দেখা যায়, ইলিশ মাছের কোনও স্বাদ নেই। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছি। এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার পদক্ষেপ নিতে পারে। তাহলে প্রতারিত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারি আমরা।’
গৃহবধূ আসমা মর্তুজা বলেন, ‘আসলে ইলিশ মাছ বিক্রির নামে আমরা চরমভাবে প্রতারিত হচ্ছি। দোকানদার বলে পদ্মার ইলিশ, বরিশালের ইলিশ—আমাদের বিশ্বাস করে কিনতে হচ্ছে। তবে পদ্মা বা চাঁদপুর থেকে কোনও ইলিশ মাছ রংপুর অঞ্চলে আসে না। বরিশালের কিছু মাছ আসে, তবে বেশির ভাগই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের। এ ব্যাপারে প্রশাসনেরই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে আমরা প্রতারিত না হই।’
দ্রুত অভিযানের আশ্বাস ভোক্তা অধিকারের
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর রংপুরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইলিশ মাছ বিক্রির নামে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন—এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবো।’