বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগের দিনই মৃত্যু হয় তরুণ প্রকৌশলী আরিফ শাহারিয়া সৌমিকের (২২)। এ ঘটনায় গাইবান্ধা শহরের মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসাসেবা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। স্বজনদের দাবি, সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পর সৌমিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব হয়।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে গাইবান্ধা শহরের দেশী ভোজ হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন সৌমিকের একমাত্র বড় বোন শারমিন সুলতানা। লিখিত বক্তব্যে তিনি ভাইয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা এবং কোনও অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শারমিন সুলতানা। তিনি বলেন, একমাত্র ছোট ভাই সৌমিক ছিলেন পরিবারের অত্যন্ত আদরের। সদ্য প্রকৌশল ডিগ্রি সম্পন্ন করা মেধাবী। তাকে ঘিরে পরিবারের অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল। পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি এবার শুরু হওয়ার কথা ছিল তার দাম্পত্য জীবনের নতুন অধ্যায়। কিন্তু বিয়ের আগের দিনই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। যে ভাইকে নতুন সাজে বরের বেশে দেখার কথা ছিল, তার মৃত্যুর শোক মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। চোখেমুখে ভাই হারানোর শোক নিয়েও সাংবাদিকদের সামনে সৌমিকের অসুস্থতা, চিকিৎসা নেওয়া এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন শারমিন।
শারমিন সুলতানার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌমিক বিয়ের আগের দিন বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে নিজেই হেঁটে মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় কাটান। এ সময় তাকে কয়েকটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরিবারের দাবি, সেখান থেকে বাড়িতে ফেরার পর সৌমিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা পেতেও বিলম্ব হয়।
পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়ার সময় থেকে শুরু করে হাসপাতালে নেওয়ার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসাসেবা, ব্যবস্থাপনা ও অতীত কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সৌমিকের স্বজনরা। তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি আগে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পরিচালিত হতো; পরে সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে গাইবান্ধা শহরে স্থানান্তর করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন, জনবল, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা যথাযথ কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে শারমিন সুলতানা ছাড়াও পরিবারের অন্য সদস্য ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এ জন্য জেলা সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
সৌমিককে হাসপাতালে নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের সেদিনের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মো. মেহেদী হাসান জানান, সৌমিককে হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় পরিবারের কাছ থেকে অসুস্থতার বর্ণনা শুনে ডেঙ্গু বা টাইফয়েড জ্বরের সম্ভাবনা মনে হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও পরীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি।
অন্যদিকে, মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী কাইয়ুম পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, সৌমিক সাধারণ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে তাদের প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন এবং সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন। তাকে কোনও ইনজেকশন দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
কাইয়ুম বলেন, সৌমিকের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর তাকে দ্রুত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যাওয়ার স্পষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার মান এবং অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আবার কার্যক্রম শুরুর ঘটনা ঘটে।
সম্প্রতি পলাশবাড়ী উপজেলায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করার পর আবার কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে অসুস্থ অবস্থায় সৌমিককে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন শুক্রবার তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কনের বাড়িতে বরবরণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল আলোকসজ্জিত গেট; সৌমিকের বাড়িতেও চলছিল বিয়ের প্রস্তুতি। শুক্রবার বাদ জুমা গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশন জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সৌমিক গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানি পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন।
বিয়ের আগের দিন তার এমন মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের দাবি, সৌমিকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। চিকিৎসায় কোনও অবহেলা, ভুল বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে—এমনটাই প্রত্যাশা পরিবার ও এলাকাবাসীর।