‘আমার ফুড়ি (মেয়ে) অখন সুস্থ নায় (নয়)। কয়েকদিন আগে তাইরে (খাদিজা আক্তার নার্গিস) কলেজও নেওয়ার পরে তাই (সে) ডরাইগেছিল (ভয় পেয়েছিল)। অউ (এভাবেই) অলান (এখন) দিন যায় আমার ফুড়ির। বেশি সময় আমার ফুড়ি ঘুমও (ঘুমিও) থাকে। বাড়ির বাইরে (বাহিরে) কোথাও লইয়া গেলে ডরাই যায় (ভয় পায়) খাদিজা। তাইরে লইয়া (নিয়া) খুব কষ্টে দিন পার খররাম (করতেছি)।’ এভাবেই মেয়েকে নিয়ে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলেন নার্গিসের মা মনোয়ারা বেগম।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ডিগ্রি (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নার্গিস হত্যা চেষ্টার একবছর পূর্ণ হয়েছে মঙ্গলবার (৩ অক্টোবর)। ২০১৬ সালের এই দিনে সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরপাড়ে হামলার শিকার হন তিনি। ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের চাপাতির এলোপাতাড়ি আঘাতে নার্গিসের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এখন তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে ভুলতে পারছেন না সেই দুঃসহ স্মৃতি। সাংবাদিকদের সঙ্গে নার্গিস কথা বলতে চান না বলেও জানান তার স্বজনরা। নার্গিসের মা মনোয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিলেটের আদালতে বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বিচারক দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতেও যেন এই রায় বহাল থাকে— এটাই এখন তাদের চাওয়া।
নার্গিসের বাবা ও ভাই প্রবাসে থাকায় তার পরিবারের দেখাশোনা করে যাচ্ছেন ফুফাতো ভাই নোমান আহমদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নার্গিস পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে নিয়ে গেলেও কাজ হচ্ছে না। সে এখনও কলেজে যেতে চায়। কিন্তু নিয়ে গেলে আবার ভয়ও পায়। কোনোকিছু সে বললে তা আবার পরে ভুলে যায়। হাতের সমস্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এ কারণে তাকে কয়েকদিনের মধ্যে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে চিকিৎসার জন্য।’ হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে ঢাকায় দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটে নিজ বাড়িতে ফেরেন নার্গিস।
নার্গিসের চাচা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘সিলেটের রায়ের বিরুদ্ধে বদরুলের পরিবার উচ্চ আদালতে আপিল করেছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। উচ্চ আদালতেও যেন বদরুলের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের রায়টি বহাল থাকে— এটাই আমাদের পরিবারের চাওয়া।’ তিনি জানান, নার্গিস শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনও সুস্থ নন। তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। নার্গিসের পড়ালেখা এখনও শুরু হয়নি। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান, নার্গিসের পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরও সময় লাগবে।
এদিকে কারাগার সূত্রে জানা যায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া বদরুল আলম কারাগারে সাজা ভোগ করছে। কারাগারের বাগানে মালির কাজের পাশাপাশি উৎপাদন শাখাতেও সে নিয়মিত কাজ করছে। এছাড়াও, কারাগারের রাইটারের কাজও করছে বদরুল।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে কারাগারে যেভাবে বদরুলের থাকার কথা সেভাবেই বদরুল রয়েছে। নার্গিসের ওপর হামলার ঘটনায় সে অনুতপ্ত।
সিলেটে বদরুলের আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘মামলাটি নিয়ে বদরুলের পরিবার উচ্চ আদালতে আপিলে করেছে কিনা, এ বিষয়ে কোনও তথ্য আমার জানা নেই। আপিল করা হয়ে থাকলে তা ঢাকার আইনজীবী জানবেন।’
সিলেট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুনেছি আলোচিত এ মামলাটির রায়ের ব্যাপারে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। উচ্চ আদালতেও যেন বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে, এই প্রত্যাশা রাখি।’ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নার্গিস হত্যাচেষ্টা মামলার রায় ঘোষণাকে একটি দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেন তিনি।
নার্গিসের ওপর হামলার দুই দিন পর ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বদরুল। ওই বছরের ৮ নভেম্বর খাদিজা হত্যা চেষ্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার এসআই (সাবেক) হারুনুর রশীদ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১৫ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট গৃহীত হয়। ২৯ নভেম্বর আদালত বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় নার্গিসের চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদরুলকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। মামলায় ৩৭ সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে বদরুল আলমের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন।
আরও পড়ুন-
নার্গিস এক জীবন্ত কিংবদন্তী: আদালত








