শীত শুরু হওয়ার আগেই সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে গত প্রায় এক সপ্তাহে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৬৩৯টি শিশু। এর মধ্যে এক শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংখ্যা কম হওয়ায় দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে। এ অবস্থায় অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের ৬৩৯টি শিশু নিউমোনিয়ার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। সদর হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের শয্যা ২৯টি হলেও কেবল ২৫ তারিখেই ৮২টি শিশু ভর্তি হয়। শিশু ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় এসব শিশুদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে শিশু ও পুরুষ ওয়ার্ডের বারান্দায়।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ভর্তি রেজিস্ট্রার থেকে জানা যায়, চলতি মাসের ১৮ তারিখে ৯৩টি, ১৯ তারিখে ৮৭টি, ২০ তারিখে ১১৫টি, ২২ তারিখে ৯৬টি, ২৩ তারিখে ৮৬টি, ২৪ তারিখে ৮০টি ও ২৫ তারিখে ৮২টি শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এই এক সপ্তাহে শিশু ওয়ার্ডের শয্যা ধারণক্ষমতারও চারগুণ বেশি শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দেড় বছর বয়সী এনামুল হকের বাবা সাদিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছি। শীতের বাতাস-রোদ সবই তার ওপর দিয়ে যায়।’ একই অভিযোগ রয়েছে অন্য অভিভাবকদেরও।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি গ্রামের আড়াই বছর বয়সী জাকুয়ানের বাবা বলেন, ‘মানুষ হাসপাতালে শখে বেড়াতে আসে না, সেবার জন্য আসে। এ হাসপাতালে শুধু নাই আর নাই। সিট নাই, ওষুধ নাই, চুলা নাই— সবই নাই আর নাই।’
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের একমাস বয়সী তাওহিদার বাবা বলেন, ‘শিশুদের খাবার তৈরি করতে গরম পানি লাগে। অথচ ওয়ার্ডে একটিও গ্যাসের চুলা নাই। দিনে কয়েকবার বাচ্চার খাবার তৈরি করতে হয়। এর জন্য ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের।’
শিশুদের অক্সিজেন ও নেবুলাইজার দেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে থাকতে হয় বলে অভিযোগ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গ্রামের জালাল মিয়া ও মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের জগজীবনপুর গ্রামের সাজ্জাদুর রহমানের। আবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও বাইরে থেকেই প্রায় সব ওষুধ কিনতে হয় বলে অভিযোগ করলেন ভাতিজাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছাতারকোনা গ্রামের দুলাল আহমদ।
শিশু ওয়ার্ডে রাতে কর্তব্যরত সিনিয়র স্টাফ নার্স মস্তুরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হঠাৎ করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খুব চাপ যাচ্ছে। এক মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। শীত চলে আসায় এবং পরিবারের সদস্যদের অসচেতনতার জন্যই শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’
শিশুদের স্বজনদের অভিযোগ প্রসঙ্গে সিনিয়র এই স্টাফ নার্স বলেন, ‘সিটের সংকট তো আছেই। রোগী বেশি হওয়ায় সবাইকে তো সিট দেওয়া যায় না। সিট না পাওয়া অনেকেই দুর্ব্যবহার করে বসেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘একদিকে রোগীর চাপ যেমন বেশি, তেমনি রাতে ওয়ার্ডে নিরাপত্তা প্রহরী থাকে না। এতে আমরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হঠাৎ করে শীত চলে এলে শিশুরা আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাই শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। মূলত ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবে এটি হচ্ছে। এটি কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।’ রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ মজুদ রয়েছে এবং সেগুলো চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
অক্সিজেন, নেবুলাইজার ও চুলার সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘অক্সিজেন ও নেবুলাইজারের কোনও সংকট নেই। তবে গ্যাসের চুলা ও শয্যা সংকট রয়েছে।’ নতুন ভবনটি চালু হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না বলে আশাবাদ জানান তিনি।
ঋতু পরিবর্তনের এই সময় শিশুদের বাবা-মায়ের করণীয় সম্পর্কে ডা. আশুতোষ বলেন, ‘এসময় নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করতে শিশুদের বাবা-মায়ের আরও সচেতন হতে হবে। শিশুরা যেন ঠাণ্ডায় না থাকে সেদিকে যেমন খেয়াল রাখতে হবে, আবার ঘামে ভিজেও যেন ঠাণ্ডা না লাগে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শিশুদের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বিছানার ব্যবস্থা করতে হবে, শিশুরা প্রস্রাব করলে দ্রুত প্যান্ট বদলে দিতে হবে।’ শিশুর মায়েদেরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন- রক্তের গ্রুপ ভুল লিখে রোগীর স্বজনদেরও আটকে রাখা হলো হাসপাতালে








