সুনামগঞ্জ শহরকে শত্রুমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয় ৫ ডিসেম্বর। ৬ ডিসেম্বর সকাল থেকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। ৭টি কোম্পানিতে ভাগ হয়ে শহরের দিকে এগুতে থাকেন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা। সন্ধ্যার দিকে তারা শত্রুশিবিরে চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি নেন। এদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের খবর গোপনে পৌঁছে যায় পাকিস্তানি সেনাদের কানে। লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি না থাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের খবর পেয়েই পাকিস্তানি সেনারা পালানোর ছক কষতে শুরু করে এবং মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর চূড়ান্ত আঘাতের আগেই শহর ত্যাগ করে।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬ ডিসেম্বর এ জেলা মুক্ত হলেও সেখানে যুদ্ধটা চলেছে অনেক দিন ধরে।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, মেজর মোত্তালিব, ক্যাপ্টেন যাদব, ক্যাপ্টেন রগুনাথ ও ক্যাপ্টেন ভাটনগর সুনামগঞ্জ শহরকে শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা তৈরি করেন। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তি ও মিত্রবাহিনীকে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’, ‘ই’, ‘এফ’ ও ‘এম’ –এই সাতটি কোম্পানিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ‘এ’ কোম্পানি যোগীরগাঁও, ‘বি’ কোম্পানি হালুয়ারঘাট, ‘সি’ কোম্পানি বেরিগাঁও, ‘ডি’ কোম্পানি ভাদেরটেক, ‘ই’ কোম্পানি মল্লিকপুর ও ‘এফ’ কোম্পানি বেরিগাঁও কৃষ্ণতলা এলাকায় অবস্থান নেয়। ‘এম’ কোম্পানি সদস্যদের রসদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের আবার সহযোগিতা করেন ‘এ’ ও ‘ডি’ কোম্পানির সদস্যরা। এদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের সদর দফতর ভারত সীমান্ত সংলগ্ন বনগাঁওয়ে রাখা হয় আরও একদল মুক্তিযোদ্ধাকে।
পরিকল্পনা মতো ক্যাপ্টেন ভাটনগর চিনাকান্দি থেকে গৌরারং, ক্যাপ্টেন যাদব বনগাঁও থেকে আমবাড়ি এবং মেজর মোত্তালিব যোগিরগাঁও থেকে শহরের দিকে এগুতে থাকেন। বাকিরাও একইভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু তারা শহরে পৌঁছে বুঝতে পারেন, ইতোমধ্যে কোণঠাসা হয়ে পড়া পাক বাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়েছে।
সূত্র জানায়, ৬ ডিসেম্বর ভোরে মেজর মোত্তালিব ও ক্যাপ্টেন ভাটনগর তাদের প্লাটুনসহ শহরে প্রবেশ করে কোথাও শত্রুর দেখা পাননি।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মতিউর বলেন, ‘শহরকে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ করে রেখেছিল পাক বাহিনী। পাকবাহিনীর অত্যাচারে শহরবাসী ছিলেন জর্জরিত। ৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর ভয়ে পাকবাহিনী শহর ছেড়ে পালায়। এতে মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। তবে এই আনন্দ-উল্লাসের মাঝেও একধরনের উৎকণ্ঠা ছিল, ছিল ভীতি। নিজের এলাকা শত্রুমুক্ত হয়েছে, প্রিয় দেশটা তো তখনও স্বাধীন হয়নি।’
মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ‘সুনামগঞ্জ শহরের পিটিআই ভবনে পাকবাহিনীর ঘাঁটি ছিল। এ ভবনকে তারা র্টচারসেল হিসেবে ব্যবহার করতো। শহর হানাদারমুক্ত হওয়ার পর এখান থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষের লাশ ও কংকাল উদ্ধার করা হয়।’
সে সময়ের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হোসেন পীর বলেন, ‘পাকবাহিনী লেজ গুটিয়ে পালালে শহরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন-রাস্তাঘাটে বিস্ফোরক পুঁতে রাখা হয়েছে কিনা, আমরা পরীক্ষা করে দেখি।’
তিনি আরও জানান, সুনামগঞ্জকে মুক্ত ঘোষণার পর মেজর মোত্তালিবের নেতৃত্বে ত্রাণ ও পুর্নবাসনের কাজ শুরু হয়। এছাড়া যুদ্ধবিধস্ত শহরের সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখভালের জন্য দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী এমএনএকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে সদস্য হিসেবে ছিলেন আব্দুল হেকিম চৌধুরী, এমপিএ আব্দুর রইছ, এমপিএ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এমপিএ শামছু মিয়া চৌধুরী, এমপিএ আব্দুজ জহুর, আলফাত উদ্দিন আহমদ, হোসেন বখ্ত, অ্যাড. আলী ইউনুছ। এরা সবাই ছিলেন সর্বদলীয় স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ কমিটির সদস্য।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ইউনিট কমান্ডার হাজী নুরুল মোমেন জানান, মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট ও সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।







