নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি সুনামগঞ্জের ফসলরক্ষা বাঁধ তৈরির কাজ। কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) নীতিমালা অনুযায়ী সুনামগঞ্জে ফসলরক্ষা বাঁধ তৈরির শেষ সময় ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ৬০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৪০ ভাগ কাজ এখনও চলছে।ফলে আবারও আগাম বন্যায় ফসলহানির আশঙ্কা করছেন জেলার কয়েক লাখ কৃষক।তারা বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবি জানান। আগামী ১০/১২ দিনের মধ্যেই এই বাঁধ তৈরির কাজ শেষ হবে আশা প্রকাশ করেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভুঁইয়া।
হাওর পাড়ের মানুষের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল। এই ফসল আগাম বন্যার কবল থেকে রক্ষায় ‘কাবিটা নীতিমালা ২০১৭’-এর আওতায় উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতে ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯ হাওরে ৯৬৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ১৫০০ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরুর কথা থাকলেও হাওর ও নদীর পানি না কমায় প্রায় একমাস পর এই বছরের জানুয়ারির মধ্যভাগে শুরু হয় বাঁধের কাজ। ফলে নির্ধারিত সময়ে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
জেলার তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার আঙ্গারুলি হাওর ও মাটিয়ান হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, এখনও অনেক বাঁধের কাজ চলছে। আবার কোথাও কোথাও বাঁধ নির্মাণের কাজ কেবল শুরু হয়েছে। নীতিমালা না মেনে পিআইসির লোকজন বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তোলন করে বাঁধের নির্মাণ কাজ চালাচ্ছে। অন্যদিকে বৃষ্টিপাতের মৌসুম শুরু হওয়ায় সুষ্ঠুভাবে বাঁধ নির্মাণ কাজ হবে কিনা, এ নিয়েও দুশ্চিন্তায় কৃষকরা।
জেলা খামারবাড়ি সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অগ্রগতি প্রতিবেদনে জানা যায়, সদরে ৭০ ভাগ, বিশ্বম্ভরপুরে ৫৫ ভাগ, জামালগঞ্জে ৬৫ ভাগ, তাহিরপুরে ৫৫ ভাগ, ধর্মপাশায় ৭০ ভাগ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ৫০ ভাগ, দোয়রাবাজারে ৬৫ ভাগ, দিরাইয়ে ৬০ ভাগ, ছাতকে ৩০ ভাগ, শাল্লায় ৫০ ভাগ ও জগন্নাথপুর উপজেলায় ৫০ ভাগসহ সারা জেলায় ৫৮ দশমিক ২৭ ভাগ ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর ও ধর্মপাশা উপজেলায় সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। সবচেয়ে কম কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে ছাতক উপজেলায়।
জামালগর গ্রামের তৈমুর আলী বলেন, ‘গত বার আগাম বন্যায় জেলার কয়েক লাখ কৃষকের একমাত্র বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। এবারও বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। এখনও বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। আমরা দ্রুত ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবি জানাই।’
বড়দল গ্রামের মুদি দোকানদার মো. আলীনুর মিয়া বলেন, ‘গেলবারের চেয়ে বাঁধে মাটি অনেক বেশি পড়ছে। বাঁধের ওপরে যদি হিজল করচের বাগান করে দেওয়া যায় তাহলে প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণে সরকারের এত টাকা খরচ করতে হবে না।’
মাটিয়ান হাওরের তীরবর্তী কাউকান্দি গ্রামের কৃষক মোতালিব মিয়া বলেন, ‘সরকার প্রত্যেক বছর এত টাকা বরাদ্দ দেবে না। তাই বাঁধের কাজ যেন ভালোভাবে করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।’
শনির হাওর পাড়ের মারালা গ্রামের কৃষক নূর আলী বলেন, ‘হাওরে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করলেই হবে না, বাঁধগুলো যেন টিকিয়ে রাখা যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। ফসল উঠে গেলে বাঁধ কেটে দিয়ে মাছ শিকার, বাঁধের ওপর দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হবে। তাহলে সরকারি টাকা সাশ্রয়সহ বাঁধগুলো টেকসই হবে।’ তাহিরপুর উপজেলার আঙ্গুর আলী পিআইসি কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল বাছিত বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের কার্যাদেশ আগে পেলেও মাটির অভাবে কাজ শুরু করতে পারেনি অনেকেই। এছাড়া অনেক প্রকল্প এলাকায় পানি থাকায় বাঁধ নির্মাণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।’
তাহিরপুর উপজেলার বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান মো. আযহার আলী বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর হাওরের পানি দেরিতে নেমেছে। অনেক বাঁধের গোড়ায় পানি ছিল। যেখানে বাঁধ নির্মাণের কথা সেখানেও পানি ছিল। তাই নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের কাজ শুরু করা যায়নি।’ তবে এক সপ্তাহের মধ্যে বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে দলীয়করণসহ সময় মতো হাওরের পানি না কমায় কাজ শেষ হয়নি। এমনকি মাটিয়ান হাওরের বোয়ালমারা বাঁধের কাজ চলতি সপ্তাহে শুরু হয়েছে। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজার (জাঙ্গাল)। জেলার সবকটি হাওরে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখনও বাঁধের কাজ চলছে। অন্যদিকে বৃষ্টিবাদলের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। যদি বৃষ্টিপাতের আগে কাজ শেষ করা না যায় তবে পুরো জেলার ফসল ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।’
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন, ‘এ বছর হাওরের পানি দেরিতে নামায় বোরো আবাদ ১৫ দিন পিছিয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হলে হাওরের কৃষকরা স্বস্তি পাবেন।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত বছর ডিসেম্বর মাসেও হাওর ও নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে হাওরের পানি নিষ্কাশন দেরিতে হয়েছে। অনেক জায়গায় পানি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নেমেছে। এছাড়া নতুন নীতিমালা অনুযায়ী পিআইসি কমিটি গঠনে অনেক সমস্যা হয়েছে। তারপরও বাঁধের ৬০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ১০/১২ দিনে মধ্যে শেষ হবে।’ মার্চের ১০ তারিখের মধ্যে হাওরের পুরো কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা।








