বাস্তব জীবনের সফলতার গল্প বুনেছেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত প্রভাত চন্দ্র দাসের সন্তান বৃক্ষপ্রেমী প্রতাব চন্দ্র দাস। ২০০২ সালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার এলাকার প্রাচীন একটি রেইনট্রি গাছের তলা থেকে বীজ কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলন তিনি। কুড়ানো বীজ পলিব্যাগে রোপন করে ৪০টি চারা উৎপাদন করেন। ৪০টি চারা তুলতে খরচ হয় মাত্র ২৫ টাকা। উৎপাদিত চারার মধ্যে নিজের বাড়িতে লাগান ২৫টি চারা, বাকি ১৫ টি চারা প্রতিটি ৩ টাকা করে গ্রামেই বিক্রি করেন। এভাবেই শুরু হয় বৃক্ষপ্রেমী প্রতাবের নার্সারির যাত্রা।
২০০৭ সালে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের কারামুক্তির জনসভা দেখতে গিয়েছিলেন প্রতাব। তখন ছিল ভাদ্র মাস। জনসভায় আসা নেতাকর্মীরা প্রচুর পরিমাণে বরিশালের আমড়া কিনে খেয়েছিলেন। জনসভা শেষে তিনি নিজে পথশিশুদের সহযোগিতায় জনসভাস্থল থেকে মানুষের খেয়ে ফেলে দেওয়া আমড়ার বীজ সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে আসেন। এগুলো থেকে উৎপাদিত চারা ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এখনও মানুষের ফেলে দেওয়া ফলের বীজ সংগ্রহ করে বাড়ি নিয়ে এসে চারা উৎপাদন করেন তিনি। কুড়িয়ে পাওয়া বীজ ও ২৫ টাকা পুঁজি নিয়ে প্রতাবের নার্সারির যাত্রা শুরু হলেও গেল ১৯ বছরে তিনি অর্ধকোটি টাকার চারা বিক্রি করেছেন।
পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন প্রতাব। আশির দশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে সিলেট শহরে চলে যান। সিলেটে ১৯৮২-৯৯ সাল পর্যন্ত কখনও দিনমজুরি, কখনও ঠিকাদারি ব্যবসা, আবার কখনও অন্যের অধীনে চাকরিও করেছেন। বার বার পেশা পাল্টেছেন নিজের ভাগ্য বদলের আশায়। শেষ পর্যন্ত সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার গিয়াস উদ্দিন নামের এক বৃক্ষপ্রেমী ফরেস্ট কর্মকর্তার দোকানে দীর্ঘ কয়েক বছর কাজ করেন তিনি। ওই কর্মকর্তার সংস্পর্শে থেকে নার্সারি করার প্রেরণা পেয়েছিলেন প্রতাব। পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে এসে নার্সারি করে তিনি শুধু নিজের বেকারত্ব-ই দূর করেননি, স্থানীয়দের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন।
২০০৮ সালে প্রতাবের নার্সারিটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্তৃক সুপ্তা নার্সারি নামে লাইসেন্স পায়। বসতবাড়ির আশপাশের ৯০ শতাংশ জমি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা হয় নার্সারিটি। আম, কাঁঠাল, কুুল, ভিয়েতনামি নারকেল, কামরাঙ্গা, লেবু, চামল, বেলজিয়াম, কদম, ইউক্যালিপ্টাস, রেইনট্রি, জলপাই, আমলকি, বহেরা, হরীতকী, অ্যালোভোরা, নিম, চালতা, তেতুল, লটকন, তেজপাতা, নাগামরিচসহ ৪৫ প্রজাতির প্রায় ৮০ হাজার বনজ, ফলজ, মসলা ও ঔষধি গাছের চারা রয়েছে সেখানে। প্রতিটি চারাগাছ তিন থেকে আটমাস বয়সী।
জানা যায়, গত মৌসুমে নার্সারি থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার চারা পাইকারিভাবে বিক্রি করেছেন প্রতাব। নার্সারি ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই তার যাবতীয় সাংসারিক খরচসহ তিন সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি এলাকার ২০টি পরিবারের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন। সময়মতো বাজারজাত করতে পারলে আগামীতে চারা বিক্রি করে প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশাবাদী তিনি।
প্রতাব জানান, গত বন্যায় নার্সারির প্রায় ২০ হাজার চারাগাছ মারা যায়। এতে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। কোনও সরকারি প্রণোদনা না পেয়ে স্থানীয় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। নার্সারি ব্যবসার পাশাপাশি এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন প্রতাব দাস। ২০০৩ সাল থেকে টানা দুইবার বিপুল ভোটে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
তার কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকায় আরও কয়েকটি নার্সারি গড়ে উঠেছে। শুধু নার্সারি-ই নয়, পতিত জমি আবাদ করে উৎপাদন করছেন বিষমুক্ত শাকসবজি। নার্সারির পাশেই দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তত্ত্বাবধানে ৩৩ শতক জমিতে সূর্যমুখী ফসলের প্রদর্শনী দেখা গেছে।
প্রতাব দাসের স্ত্রী সীতা রাণী দাস বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছর স্বামী প্রতাব দাস পান্ডারগাও ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নার্সারি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করছেন। সংসারের কাজ শেষে বাকি সময় স্বামী-স্ত্রী-সন্তান সবাই নার্সারিতে কাজ করেন।
ছোট ছেলে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র প্রদ্যুন্ন দাস প্রকাশ বলেন, বাবা-মা দিনের বেশিরভাগ সময় নার্সারিতে কাটান। প্রতিটি চারার সঙ্গে তাদের আত্মার বন্ধন। নিজের হাতে বীজ সংরক্ষণ ও বীজ থেকে চারা তৈরির কাজ করি আমরা।
সুপ্তা নার্সারির স্বত্বাধিকারী বৃক্ষপ্রেমী প্রতাব চন্দ্র দাস বলেন, মানুষ টাকা রোজগারের জন্য বিদেশে যায়, আর আমি যাই গাছের কাছে। এ দেশের মাটিতে সোনা ফলে, তারা সেটি দেখেন না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় তিনি সবুজের বিপ্লব করতে চান।









