নানা আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনার পর সিলেটের বিয়ানীবাজারে উৎসবমুখর পরিবেশে জমজমাট নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের সুনাই নদীতে ঐতিহ্যবাহী এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। বাইচ কেন্দ্র করে নদীর দুই তীরে ভেঙে পড়েছিল উৎসুক জনতার ঢল। বাইচ শেষে সন্ধ্যায় সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী বিজয়ীদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ করেন।
জানা যায়, লাউতা ইউনিয়নের লাউতা-বাহাদুরপুর যুব সমাজের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তবে এবার বাইচ আয়োজনের বিপক্ষে একটি মহল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদ হলে এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে ২২ আগস্ট দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তখন এর সমাধান হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিযোগীরাও নৌকা নিয়ে নদীতে আসেন। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শুরু হয় প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিকতা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নদীর দুই পাড়, সড়ক ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড় আরও বাড়তে থাকে।
এবারের প্রতিযোগিতায় কালিজুরির ‘পাগলা নৌকা’, শরীফগঞ্জের ‘হাকালুকি বাঘ নৌকা’ ও সুজানগরের ‘স্বাধীন বাংলা নৌকা’ অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ শেষে ফাইনালে মুখোমুখি হয় ‘হাকালুকি বাঘ’ ও ‘পাগলা’ নৌকা। তবে ফাইনালে দুই নৌকা একই সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নেমে পৃথকভাবে দৌড় শেষ করায় দর্শকদের প্রত্যাশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। এতে ফাইনালের ফলাফল নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। তবে দীর্ঘ অপেক্ষা ও নানা জটিলতার পর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শকদের মধ্যে উৎসাহ-উচ্ছ্বাসে কোনও ঘাটতি দেখা যায়নি।
দর্শকরা জানান, নৌকাবাইচ তাদের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং গ্রামীণ জনপদের মানুষের আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বছরের একবার আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সারি সারি নৌকা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ, বাদ্যযন্ত্রের সুর ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে নদীর পাড় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তাদের ভাষ্য, ফাইনাল অমীমাংসিত হওয়ায় কিছুটা হতাশা থাকলেও দীর্ঘ জটিলতার পর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়াটাই বড় বিষয়। যে আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে তারা এসেছিলেন, সেটি অনেকাংশেই পূরণ হয়েছে।
নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। এসময় তিনি বলেন, “নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এ ধরনের প্রতিযোগিতা প্রান্তিক জনপদের মানুষের বিনোদনের অন্যতম খোরাক। নৌকাবাইচ কোনও ধর্মবিরোধী কাজ নয়। আমরা চাই প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে। সুনাই নদীতে প্রতিবছর এ আয়োজন হবে। এটিকে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রক্ষা করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার, বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম, লাউতা ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, মোল্লাপুর ইউপি চেয়ারম্যান এম এ মান্নান, সুজানগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নছিব আলী, লাউতা ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন, বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজমুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আয়োজক সংগঠনের সদস্য আমিনুল ইসলাম বলেন, “সুনাই নদীর আজকের নৌকাবাইচ দেখতে মানুষের ঢলই প্রমাণ করেছে নৌকাবাইচ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এটিকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাবাইচের মতো প্রাচীন এই প্রতিযোগিতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।”








