দেশে করোনা দেখা দেওয়ার পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। ভবন বন্ধ থাকলেও রাজধানীর নামিদামি স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস চালু করে। শিক্ষার্থীরা তাতে ক্লাস করছে, পরীক্ষাও দিচ্ছে। অন্যদিকে সারাদেশে তো দূরের কথা, খোদ রাজধানীর অনেক স্কুলেই অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, অনলাইনে ক্লাসের ঘাটতির কারণে ভবিষ্যতে শিক্ষায় একটা বড় বৈষম্য দেখা দেবে না তো?
কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এতদিনে অনলাইনে ক্লাস করার ধারা গড়ে উঠেছে। অনেকেই এখন গুগল ক্লাসরুমে হোমওয়ার্ক আপলোড করতে অভ্যস্ত। এর বাইরে জুম ও মিট প্লাটফর্মও জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
আবার একদল ক্লাস করেছে, অন্যরা পারছে না। এতে করে জানার ঘাটতি নিয়েই অনেক শিক্ষার্থী উঠে যাবে পরের ক্লাসে। মূল পড়াশোনায় দেখা যাবে একটা ভয়াবহ ঘাটতি।
মাগুরার আড়পাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকিব শেখ জানালো করোনায় স্কুল বন্ধের পরে তাদের আর ক্লাস হয়নি। মোবাইলে অনলাইন ক্লাসের কথা জানতে চাইলে সে বলে ‘আমাদের এখানে এসব হয় না’।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্যও তৈরি হবে। জানার ঘাটতি থাকায় পরের ক্লাসের পড়া বুঝতে কষ্ট হবে অনেকের। তাদের অভিমত, সরকারের উদ্যোগ থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেটের গতি ও মূল্য, স্মার্টফোন সঙ্কটের ফলে সবাই অনলাইনে ক্লাস করতে পারেনি। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বড় বড় শহরগুলোর চিত্র মিশ্র হলেও জেলা, উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে অনলাইন ক্লাসের কথা চিন্তাও করা যায় না। সেখানে পড়াশোনা হচ্ছে না বললেই চলে।
প্রযুক্তি বৈষম্য ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করার ফল সম্পর্কে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের মোবাইলফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। এই অবকাঠামোগত সমস্যা ছাড়া আরও কোনও সমস্যা ছিল না। তারপরও অনলাইন ক্লাস নিয়ে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। অনেকেই ক্লাস করতে পারছে না। শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য, ধনী ও গরীবের মধ্যে বৈষম্য; এমনটা দিনে দিনে বাড়বে।
তিনি আরও মনে করেন, অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার মতো যোগ্য শিক্ষকের অভাবও ছিল। অনেকে অবকাঠামোগত সুবিধা পায়নি, অনেকে চায়ওনি। অনলাইনে শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগও ছিল না। মোবাইল অপারেটররা তাদের ইন্টারনেটের দাম কমিয়েছে, শিক্ষার্থীদের জন্য প্যাকেজ (সফটওয়্যার) তৈরি করেছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় ইউনিয়ন পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু ঘাটতি রয়েই গেছে। অনলাইন ক্লাস প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। করোনা শেষ হলে আবার হয়তো স্কুলে ফেরা যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাদের এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর খুবই জরুরি।
দেশের ৫৮৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিটিসিএল’র মাধ্যমে ফ্রি ওয়াইফাই জোন তৈরি, দেশের ৪০ শতাংশ এলাকা ফোর-জি কাভারেজের আওতায় আনার কথাও উল্লেখ করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী।
স্কলাস্টিকা স্কুল উত্তরা শাখার দুই শিক্ষার্থী ওহী এবং ওয়াসী জানালো, করোনায় স্কুল বন্ধের কিছুদিন পরেই তাদের অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়। ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন তাদের অনলাইনে ৩-৪টা ক্লাস হয়। গুগল মিটে তাদের ক্লাস হয়েছে। এখন পরীক্ষা চলছে।
এক্সেল একাডেমিতেও নিয়মিত ক্লাস হয়েছে অনলাইনে। ওই স্কুলে কেজি ও ক্লাস থ্রির দুই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জানা গেল তাদের প্রতিদিন ক্লাস হয়েছে ৪-৫টা করে। প্রতিটা ক্লাস ৪০ মিনিটের। ১৭ ডিসেম্বর এই টার্মের ক্লাস শেষ হলো বলেও জানাল তারা।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল হিড ইন্টারন্যাশনাল অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। স্কুলটির স্ট্যান্ডার্ড সেভেন পড়ুয়া রাকিন জানালো, সপ্তাহে ৫ দিন তাদের অনলাইনে ক্লাস হয়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত। তিনটা ক্লাসের পরে বিরতি দিয়ে আবার ক্লাস হয়।
আদমজী ক্যান্ট. পাবলিক স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী অলিন্দ সরকার দুরন্ত বললো তাদেরও নিয়মিত ক্লাস হয়েছে অনলাইনে। প্রতিদিন ৪০ মিনিটের তিনটি করে ক্লাস। ২০ মিনিট বিরতিও ছিল এর মাঝে। পরীক্ষাও হয়েছে অনলাইনে।
হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী জানাল, তাদের স্কুলে নিয়মিত অনলাইনে ক্লাস হয়। এ বছরের তাদের সব ক্লাস শেষও হয়ে গেছে।
রাজধানীর হারম্যান মেইনার স্কুল অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা নিচ্ছে। স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ইবতিশাম রাফিদ টুপুন জানালো তাদের অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস হয়েছে। পরীক্ষাও হয়েছে অনলাইনে।
ঢাকা সেনানিবাস এলাকার নির্ঝর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল নিয়মিতভাবে অনলাইনে ক্লাস নিয়েছে। শুরুর দিকে জুম প্ল্যাটফর্মে ক্লাস নিলেও পরে গুগলের ক্লাসরুম ও মিট ব্যবহার করে ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাসীফ আবিদ দিব্য বলল, তাদের নিয়মিতভাবে অনলাইনে ক্লাস হয়েছে। ‘স্যাররা আমাদের অনলাইনে পড়া ধরতেন, হোমওয়ার্ক দিতেন। এমনকি ভিডিও ক্যামেরা চালু রেখে পরীক্ষাও দিতে হয়েছে।’ দিব্যকে পিইসি পরীক্ষা দিতে না হলেও স্কুলের মূল্যায়ন পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ওই পরীক্ষার নাম ছিল ‘অনলাইন লার্নিং আউটকাম ফিডব্যাক’। তার দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া ছোটভাই কাব্যকেও একই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
ঢাকার বাইরে একটু উঁচু ক্লাসের অবস্থা শোচনীয় বলে জানা গেছে গেছে। রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের অনলাইনে কোনও ক্লাস হয় না। আমাদের কী হবে?
সে জানাল, ‘আমরা যারা ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকাউন্টিং পড়ছি তাদের সমস্যাটা বেশি। আমাদের দীর্ঘ সময় প্রাইভেট পড়া বন্ধ ছিল। এখনও ঠিকমতো চলছে না। সুতরাং প্রতিষ্ঠান খুললে হুট করে পরীক্ষার রুটিন হাতে ধরিয়ে বলবে, এতদিন কী করেছ? এমনটা হলে অন্যায় হবে আমাদের সঙ্গে।’
ওই শিক্ষার্থী তার বাড়ি বগুড়ার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সেখানেও দেখলাম অনলাইন ক্লাস হচ্ছে। কিন্তু যাদের স্মার্টফোন নেই বা মোবাইল ডাটা কেনার সামর্থ নেই, তাদের কী হবে? তারা ক্লাস করবে কিভাবে? ঢাকার কথা আলাদা। ওখানে অনলাইনে ক্লাসের অবস্থা ভালো বলে জেনেছি। আমার ভাগ্নেরা নার্সারিতে পড়ে। ওদেরও অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে।








