
গবেষণা কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অনুষজ্ঞ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোন মানের তার অনেকটা নির্ভর করে গবেষণার ওপর। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কেন্দ্র থাকলেও সেখানে মৌলিক গবেষণা নেই বললেই চলে।কোনও কোনটির নেই পর্যাপ্ত লোকবল ও কার্যালয়।বছরে একবার সেমিনার করা ছাড়া বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে এসব গবেষণা কেন্দ্র। গবেষণা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা এবং গবেষকদের বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কনসালট্যান্সি করার প্রবণতাকে গবেষণা ক্ষেত্রে দৈন্যতার জন্য দায়ী করছেন বিশিষ্টজনেরা।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে ৪৯টি। এর মধ্যে গত কয়েক শিক্ষাবর্ষে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কেন্দ্রগুলোতে গবেষণার নামে সেমিনার করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। আবার বেশ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সারা বছরেও কোনও সেমিনারের আয়োজন করা হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য এসব কেন্দ্রের মৌলিক গবেষণা না থাকায় বিশ্ব র্যাংকিং থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের। বাংলা বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত লোকবলের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা কাজ পরিচালনার নেই কোনও কার্যালয়। জানতে চাইলে কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে কেন্দ্রটির গবেষণা কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রটির জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ অনেক কম।’
কেন্দ্রটির গবেষক ও পরিচালক অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, ‘জাতীয় কবির নামে এই গবেষণা কেন্দ্রটি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সেটা অনেকটা খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। যার প্রমাণ এখন পর্যন্ত কেন্দ্রটির কোনও অফিস না থাকা। এছাড়া অর্থ বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা তো আছেই। যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়,সেটা দিয়ে মৌলিক গবেষণা তো পরের কথা,দুই-একটা সেমিনার করতেই তা শেষ হয়ে যায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক কয়েকটি অর্থবছর পর্যালোচনা করে দেখা যায় ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা যা অনুন্নয়ন বাজেটের ১ শতাংশ। এছাড়া,২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা।অনুন্নয়ন বাজেটের তুলনায় এত স্বল্প পরিমাণ বরাদ্দ গবেষণা কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মত দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।পাশাপাশি গবেষণা কাজ না হওয়ায় এতোসংখ্যক গবেষণা কেন্দ্র থাকার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলা ট্রিবিউনকে আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ গবেষণা কেন্দ্র আছে সে তুলনায় এতে কাজ করার মত গবেষকের সংখ্যা কম। তাছাড়া গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটাও তুলনামূলক কম বলা চলে। অনেক গবেষক আবার বাইরের প্রতিষ্ঠানের জন্য গবেষণা কাজ পরিচালনায় ব্যস্ত থাকেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে সে অর্থে কোনও গবেষণা কাজ হচ্ছে না।’
এদিকে কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়,বোস সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি অ্যান্ড রিসার্চ ইন ন্যাচারাল সায়েন্সেস কেন্দ্রটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে উন্নত গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। গত সেশনে এ কেন্দ্র থেকে ১২টি গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। তবে এগুলোর কোনওটিই মৌলিক গবেষণা নয়।
এ বিষয়ে কেন্দ্রটির গবেষক ও পরিচালক অধ্যাপক শামীমা চৌধুরী বলেন, ‘গবেষণা কেন্দ্রগুলোর কাজ পরিচালনা করা আসলে কেন্দ্রের সদস্যদের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করে। বোস সেন্টারে মৌলিক কোনও গবেষণা নেই।প্রজেক্টভিত্তিতে কাজ করা হয়, যার মধ্যে নিয়মিতভাবে থাকে সভা-সেমিনার। তবে এ কেন্দ্রের উদ্যোগে প্রায়ই বিভিন্ন দেশে আর্ন্তজাতিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়।’
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যবসায় গবেষণা ব্যুরো। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, ব্যাংকিংসহ ব্যবসায় শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণা কাজ করে এ ব্যুরোটি। ৩০টি প্রকল্প চালু থাকলেও মৌলিক গবেষণায় স্থবিরতা রয়েছে বলে জানান ব্যুরো সংশ্লিষ্টরা।
দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হল নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রে স্বল্পমেয়াদী একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। তবে দেশে ক্রমবর্ধমান সৌর বিদ্যুতের ব্যবহারকারীর সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতিও যথেষ্ট নয়।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র। মানববিদ্যার বিভিন্ন শাখার ওপর নিয়মিত সেমিনার, বক্তৃতামালা আয়োজন ও নিবন্ধমালা প্রকাশনা করে থাকে কেন্দ্রটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদ মাধ্যম ছাড়া তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে।
স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ,উৎসাহিত করা এবং বিদ্যমান সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বায়োটেকনোলজি গবেষণা কেন্দ্র। এর গবেষণা কর্ম থেকে প্রায় ৬০টি প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নতুন ও মৌলিক গবেষণা জোরদার করতে অন্য কেন্দ্রগুলোর মত কেন্দ্রটি তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না।
গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত সবচেয়ে পুরনো-অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর কোনও মৌলিক কাজ না হলেও সব থেকে বেশি সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। ব্যুরোর অধীনে মোট ৬টি গবেষণা প্রকল্প চলছে। গবেষণার পাশাপাশি কিছু কোর্সও চালানো হয়।
ব্যুরোর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান,বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আর্থিক সহায়তায় গবেষণা কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি রিসার্চ পেপারও পাবলিশ করা হয়েছে আর্ন্তজাতিক মাধ্যমে। তাছাড়া নিয়মিত গবেষণা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয় বলেও জানান তিনি।
এদিকে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় গবেষণা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দেখা যায়, ড. সিরাজুল হক ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র, অধ্যাপক দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র, আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ কেন্দ্র, বাংলা চরিতাভিধান গ্রন্থ প্রণয়ন কেন্দ্র, সেন্টার অব বুদ্ধিস্ট হেরিটেজ কালচার, আর্কাইভ ও ইতিহাস গবেষণা কেন্দ্র, দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্র, প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, সেন্টার ফর ডিজাস্টার ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ,সেন্টার অব অ্যাডভান্সড রিসার্চ ফর আর্টস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস,সেন্টার ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন, সেন্টার ফর মোরাল ডেভেলপমেন্ট, জীববিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, বায়ো-মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার, অর্গানিক পলিউট্যান্টস রিসার্চ সেন্টার ও জাপান স্টাডি সেন্টার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সেভাবে কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না এটা সত্য। অনেক কেন্দ্রও পূর্ণদমে পরিচালনা করা যায় না। এর কারণ হল গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে পারি না। প্রতি অর্থবছরে গবেষণা খাতে আলাদা বরাদ্দ থাকে। এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে আমরা যে পরিমাণ অর্থ প্রস্তাব করি তার অনেকাংশই কাটছাঁট করা হয়। যার কারণে গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে সেভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না।’
তবে গত দুই অর্থবছরে এ খাতে যে তুলনায় অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে আগামীতে তা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এফএস/এমএসএম/
আপ-এসটি








