ডিজিটাল মাধ্যমে পরীক্ষার ডাটাবেজে জালিয়াতি, সংঘবদ্ধভাবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ এবং নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে অনুমতি ছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের মতো অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রেখে ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ২০তম দিনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিলটি উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
সংশোধিত আইনটি ১৯৮০ সালের ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশন্স (অফেন্সেস) অ্যাক্ট’-কে সময়োপযোগী করে হালনাগাদ করেছে। প্রায় ৪৫ বছর আগে প্রণীত এ আইনটি পাবলিক পরীক্ষায় নকল, প্রশ্নফাঁস, জাল সনদ ও অন্যান্য অনিয়ম প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া পরীক্ষার ডাটাবেজে প্রবেশ, হ্যাকিং, তথ্য বিকৃত করা বা পরীক্ষার রেকর্ডে কারসাজিসহ যেকোনও ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনে ‘অর্গানাইজড এক্সামিনেশন ক্রাইম’ নামে সংঘবদ্ধ পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় পরীক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বনে সহায়তার উদ্দেশ্যে লিখিত বা মৌখিক চুক্তি করা কিংবা এমন প্রস্তাব দেওয়াও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া যাবে। সংঘবদ্ধভাবে নকল বা প্রতারণার সুযোগ সৃষ্টি করার চেষ্টাও একই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।
সংশোধিত আইনে পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বহন করে পরীক্ষা কেন্দ্র বা পরীক্ষার হলে প্রবেশ কিংবা প্রবেশের চেষ্টাকেও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করলেও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তরপত্রে অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়া পরীক্ষকদের বিরুদ্ধেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। তবে এ ধরনের অপরাধে দণ্ড দিতে হলে তৃতীয় একজন পরীক্ষকের মাধ্যমে নম্বরের অসঙ্গতি নিশ্চিত করতে হবে।
পরীক্ষা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর দায়বদ্ধতাও আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনও প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধে সহায়তা করলে, যোগসাজশে লিপ্ত হলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখলে তাদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড, লাইসেন্স স্থগিত, কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি (ডিবারমেন্ট) বা কালো তালিকাভুক্তির (ব্ল্যাকলিস্ট) ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
সংশোধিত আইনে তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষার ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত হয়রানি বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এ সুরক্ষা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে কোনও শিশু অপরাধে জড়িত হলে তার বিচার প্রাপ্তবয়স্কদের মতো না করে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সংশোধিত আইনের অধীন সব অপরাধকে আমলযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট এবং মহানগরের বাইরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এসব মামলার বিচার করবেন। বিচার কার্যক্রম ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
এ ছাড়া, আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধ বৃদ্ধির কারণে ১৯৮০ সালের বিদ্যমান আইনটি সময়োপযোগী ছিল না। সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংঘটিত অপরাধকে আইনের আওতায় আনতেই এ সংশোধন আনা হয়েছে।








