প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, বাংলাদেশ কিংবা সারা বিশ্বের প্রতিটি শিক্ষার্থীর অর্জন ও সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তাদের বাবা-মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্যের ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, হয়তো কঠিন সংগ্রামের গল্প। তাই পরিবারের সদস্যদের এই অবদানের কথা স্মরণ রাখতে এবং হৃদয় থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে।
রবিবার (১১ অক্টোবর) দুপুরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) এর ৩৮তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, একজন গ্র্যাজুয়েটের জীবনে, বিশেষ করে স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জনের পর, সমাবর্তনে উপস্থিত হওয়া জীবনে একবারের একটি অনন্য সুযোগ। এটি এমন একটি দিন যা আপনারা সারা জীবন স্মরণ রাখবেন।
তিনি বলেন, আজ যখন আপনারা আপনাদের সমাবর্তন উদযাপন করছেন, আমরা নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারছি যে আপনাদের জীবনে অনেক বড় বড় স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আপনারা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন, তা উচ্চশিক্ষায় একাডেমিয়াতেই হোক, মাস্টার্স বা পিএইচডি করার পরবর্তী ধাপেই হোক, পেশাগত ক্যারিয়ারের চাকরিতেই হোক, যা আপনারা বাংলাদেশে কিংবা দেশের বাইরে শুরু করতে যাচ্ছেন, কিংবা আপনাদের কোনও উদ্ভাবনী চিন্তাই হোক না কেন, সবকিছুই ভবিষ্যৎমুখী। এটি অসাধারণ, কারণ এটি আপনারা অর্জন করেছেন। আজ আপনারা যে সার্টিফিকেটটি পেয়েছেন, তা আপনাদের একটি আলোকিত এবং সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের জন্য প্রস্তুত করবে।
মাহদী আমিন বলেন, একই সঙ্গে আমি আপনাদের পেছনের পথচলাটির দিকেও তাকাতে বলবো। আজকে যে বর্তমান আপনারা পেয়েছেন, তা যেমন আপনাদের ভবিষ্যৎ দেবে, তেমনি এর পেছনে রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত। শিক্ষাজীবনের এই বছরগুলোতে আপনারা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, পরীক্ষার নানান উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা পার করেছেন, ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন দুশ্চিন্তা অতিক্রম করেছেন। কিন্তু আজ আপনারা এই সমাবর্তনে উপস্থিত হয়েছেন আপনাদের পিতা-মাতার লক্ষ্যপূরণ করে।
আপনারা এমন একটি অতীত ও প্রতিষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন যার রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। আইইউটি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে টিকে রয়েছে। সম্ভবত এটি দেশের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ও বটে। এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি ক্যাম্পাস, যার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে অসাধারণ সব প্রতিভাবান প্রকৌশলী তৈরি করার; যারা বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে বাস্তব প্রভাব রেখেছেন। কাজেই গ্র্যাজুয়েট হিসেবে আপনারা যখন বের হয়ে আসছেন, আপনারা সাথে নিয়ে আসছেন আইইউটির সেই ব্র্যান্ডিং।
আর ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও আইইউটির একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। কারণ আমরা যে রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত, সেই দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আরেক মহান নেতা ইয়াসির আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে এই আইইউটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তাই মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ক্ষেত্রে আইইউটির এক বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বহুবার এই ক্যাম্পাসে এসেছেন এবং সমাবর্তনে অংশ নিয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমানে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় থাকায়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আগামী দিনগুলোতে একইভাবে এখানে আসবেন।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, এই আইইউটি মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি নির্দেশ করে যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমাদের ভ্রাতৃত্ব রয়েছে, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য রয়েছে এবং আমরা একটি যৌথ ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস রাখি।
মাহদী আমিন বলেন, আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি যখন প্রযুক্তির ধারা পরিবর্তিত হচ্ছে, সামগ্রিক পরিমণ্ডল বদলে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলছি, রোবোটিক্স নিয়ে কথা বলছি। এআই হয়তো বড় বড় ডেটা তৈরি বা তা বিশ্লেষণের কাজ করতে পারে, এআই হয়তো কোড লিখতে পারে, এআই দারুণ সব আইডিয়া ও উদ্ভাবন তৈরি করতে পারে। কিন্তু কীভাবে আপনারা তা পরিচালনা করবেন, কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করবেন, তা প্রযুক্তির ওপর নয়, মানুষের ওপর নির্ভর করে।
তাই আপনাদের মূল্যবোধ, আপনাদের নৈতিক আদর্শই সর্বদা নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হবে। মানুষের সুবিবেচনা ও সততা, আমরা প্রযুক্তিকে মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার করছি নাকি কোনও অকল্যাণে ব্যবহার করছি, তা মূলত আপনাদের ওপরই নির্ভর করবে। এবং আপনারাই হলেন সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। কেবল প্রযুক্তি বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ব্যবহারের ক্ষেত্রে নয়, বরং এই প্রযুক্তি সমাজকে সাহায্য করবে নাকি সম্প্রদায়ের জন্য বাধা সৃষ্টি করবে, তা নির্ধারণেও আপনারা সিদ্ধান্তকারী।
তিনি বলেন আমরা চাই আমাদের প্রকৌশলী ও গ্র্যাজুয়েটরা, তা কারিগরি শিক্ষা থেকে হোক, ব্যবস্থাপনা থেকে হোক কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অন্য যেকোনো শাখা থেকেই হোক, শিল্পখাতকে বদলে দেবেন, সমস্যার সমাধান করবেন এবং বাস্তবসম্মত প্রশ্ন তুলবেন। আপনাদের অনেকে অসাধারণ গবেষক হবেন। আমরা চাই আপনারা বাস্তব বিশ্বের সমস্যার সমাধান করুন এবং আপনাদের উদ্ভাবিত আইডিয়াগুলো যেন সমাজকে রক্ষা করতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে অসাধারণ সব আইডিয়া সামনে আসছে। প্রযুক্তির পরবর্তী সেরা উদ্ভাবনটি যে কেবল সিলিকন ভ্যালি থেকেই আসতে হবে এমন কোনও কথা নেই। আমি বিশ্বাস করি, এবং আপনাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই ক্যাম্পাসের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকেই, আইইউটির গ্র্যাজুয়েটদের মধ্য থেকেই প্রযুক্তির পরবর্তী যুগান্তকারী বিপ্লব তৈরি হতে পারে। সেই সম্ভাবনা রয়েছে, সেই শক্তি রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক সহায়তা প্রদান এবং আপনাদের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পথ দেখিয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।