নাম গিয়াসউদ্দিন মহম্মদ কুরেশি, তবে লোকে তাকে চেনে ‘গ্যাস’ নামে। বাংলাদেশের লোক, তবে এখন ডেরা পর্তুগালের লিসবনে–সেখানে থেকেই সারা ইউরোপময় নকল জুয়েলারির চোরাই ব্যবসা চালান। বান্ধবী প্রাগের স্ট্রিপটিজ ক্লাবের নর্তকী–আর ‘গ্যাসে’র গ্যাংয়ে যারা কাজ করে তারাও সবাই বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে ইউরোপে এসে ঢুকেছে। সোজা কথায়, গ্যাস হল ইউরোপের এক ছোটখাটো বাংলাদেশি মাফিয়া!
বলিউডে শাহরুখ খান-অনুষ্কা শর্মার লেটেস্ট ব্লকবাস্টার ‘যব হ্যারি মেট সেজাল’-এ এমনই এক চরিত্রায়ন নিয়ে ভারতেই রীতিমতো গোল বেঁধেছে। ভারতের ফিল্ম সমালোচকরা সবাই মোটামুটি একমত–মাত্র পনেরো মিনিটের ওই ক্যামিও রোলে যাকে বলে একেবারে ‘ফাটিয়ে দিয়েছেন’ অভিনেতা চন্দন রায় সান্যাল। নিজে তিনি বাঙালি, বাংলাদেশি মাফিয়ার রোলে অভিনয়ও করেছেন চুটিয়ে।
কিন্তু ছবিটায় কি বাংলাদেশিদের যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে চিত্রায়ন করা হয়েছে? শুক্রবার (৪ঠা আগস্ট) ভারতে ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে তর্কাতর্কি চলছে, এবং ভারতের নামি ফিল্ম ক্রিটিকদের মধ্যেও এটা নিয়ে দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার দু’রকম মত। কেউ তো বলছেন, গোটা ছবিটার সেরা অংশ হল এই বাংলাদেশি ভিলেন–আবার কারও মতে এতে শাহরুখের বাঙালি ভক্তরা অন্তত নিঃসন্দেহে খুশি হবেন না!
কিন্তু সমস্যাটা আসলে কী নিয়ে ? বাংলা ট্রিবিউন যেটা জানতে পেরেছে, পরিচালক ইমতিয়াজ আলি যখন এই ছবির শ্যুটিং লোকেশন ফাইনাল করতে ইউরোপ চষে বেড়াচ্ছিলেন–তখনই আমস্টার্ডাম, প্রাগ, বুডাপেস্ট বা লিসবনের মতো বিভিন্ন শহরে তিনি অসংখ্য অবৈধ বাংলাদেশির দেখা পান।
তাদের সঙ্গে কথা বলে, শত বাধা টপকে কীভাবে তারা ইউরোপ এসে পৌঁছেছে বা কোনও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কেমন অনিশ্চয়তার মধ্যে কত কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছে–সেটা দেখেই ‘যব উই মেট’ বা ‘হাইওয়ে’র মতো ছবির পরিচালক ঠিক করে ফেলেন তার সিনেমায় একটা বড় অংশ জুড়ে থাকবে এই বাংলাদেশি অভিবাসীরা।
গল্পে সামান্য অদলবদল করে এরপরই তিনি নিয়ে আসেন ‘গ্যাস আর তার গ্যাং’য়ের গল্প। এই গ্যাংয়ের সদস্যরা নকল সোনাদানার অলঙ্কারের চোরাকারবার চালায়, তাদের বড়ভাই গ্যাস মাফিয়া দলের সর্দার হলেও ভারি মোলায়েম করে কথা বলেন–তবে কেউ পাসপোর্ট-ভিসা বা ওই জাতীয় নথিপত্রের কথা তুললেই গ্যাংয়ের লোকজন ভয়ে সুড়সুড় করে পালায়!
দিল্লির হিন্দুস্তান টাইমস গ্রুপের পত্রিকা লাইভমিন্টে ফিল্ম ক্রিটিক রাজ্যশ্রী সেন লিখেছেন, ‘এই বাংলাদেশিদের ভিলেন হিসেবে ভাবতে পারার জন্যই ইমতিয়াজ আলিকে বিরাট কৃতিত্ব দেবো। যারা অনায়াসে বলতে পারে বাংলাদেশে ফি বছর বন্যায় জমি-বাড়ি ভেসে যায় বলেই তারা নিরুপায় হয়ে এই ইউরোপে এসে ঠেকেছে–তারা যতই মাফিয়া হোক, অন্তরে যে বিরাট ভালো মানুষ সেটা চিনে নিতে এতটুকুও অসুবিধা হয় না।’
গ্যাসের চরিত্রে চন্দন রায় সান্যালকে বিরাট তারিফ করে এটাকে ছবির সেরা অংশ বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। খুব জনপ্রিয় এফএম চ্যানেল মির্চির ক্রিটিক জিতুরাজও অনেকটা একই সুরে অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন ইউরোপের এই বাংলাদেশি গ্যাংয়ের।
তবে একেবারেই একমত নয় কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। তারা লিখেছে, ‘পর্তুগালে অবৈধ বসবাসকারী বা ক্রিমিনাল হিসেবে যেভাবে বিশেষত বাংলাভাষীদের এই ছবিতে স্টিরিওটাইপ করা হয়েছে, তা পরিচালকের কাছ থেকে আশা করা যায় না। শাহরুখের বাঙালি ফ্যানদের এতে ক্ষুব্ধ হওয়ারই কথা।’
তবে গিয়াসউদ্দিন ওরফে গ্যাসের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য চন্দন রায় সান্যাল যে সাঙ্ঘাতিক তারিফ পাচ্ছেন তা তার টুইটার অ্যাকাউন্ট খুললেই স্পষ্ট। ছবি দেখে মুগ্ধ কেউ লিখছেন অসাধারণ, কেউ বলছেন ওই ক্যামিওটাই দাগ রেখে যায়। কোনও কোনও অবাঙালি আবার বাংলাতেও লিখেছেন, ‘বাবুমশাই তুমি তো একেবারে চটকে দিয়েছে গো’। আপ্লুত চন্দন সবাইকে একনাগাড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু ‘যব হ্যারি মেট সেজালে’ বাংলাদেশিদের এই চরিত্রায়ন নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে, ইমতিয়াজ আলি বা তার টিম কি সে সম্পর্কে অবহিত?
এই প্রশ্ন রেখেছিলাম তাদের ফেসবুক ও টুইটার পেজে। জবাবে আজ ওই ফিল্মের নির্মাতা টিমের পক্ষ থেকে সিনেমায় গ্যাসের একটি বাংলা সংলাপ ধার করেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া হয়েছে, ‘সে কি? আমার মগজে তো কিসুই (কিছুই) ঢুকতাসে (ঢুকছে) না!’
/টিএন/



