সূর্য ততক্ষণে ডুবে গেছে। ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা ছুঁই ছুঁই করছে। এর মধ্যে বিএফডিসিজুড়ে কানাঘুষা শুরু হলো, ‘রাজ্জাক সাহেব আর নেই।’
সোমবার (২১ আগস্ট)। ঠিক সন্ধ্যা। আশেপাশে যারা বলাবলি করছিলেন তাদের কাছে প্রশ্নটা করতেই উত্তরে তারা মাথা নেড়ে নিশ্চিত করলেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এখান থেকেও খবরটা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। খবর এলো, ইউনাইটেড হাসপাতালে আছেন প্রাণহীন রাজ্জাক!
কিন্তু এফডিসিতে খবরটা যেন কেউ বিশ্বাসই করতে চাচ্ছেন না। এর আগে রাজ্জাকের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছে একাধিকবার। কিন্তু এবারের গুঞ্জন আর মিথ্যে নয়! সত্যি সত্যি জীবনের রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছেন নায়করাজ।
এর মধ্যে ঝরণাস্পটে বিষণ্ন মনে হাজির বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন। শুটিং চলতে থাকা ‘বিশেষ চরিত্র ভিলেন’-এর পরিচালক মনজুরুল আলমকে তিনি জানালেন, রাজ্জাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এফডিসিতে তিন দিনের কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এখন থেকেই। এর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে শুটিং স্থগিত করলেন ওই পরিচালক।
এফডিসির দেয়ালগুলোও ততক্ষণে জেনে গেছে, রাজ্জাকের জীবনের ‘ছুটির ঘণ্টা’ বেজে গেছে! সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো বিষাদের ছায়া। চারপাশের মানুষগুলোর মন যেন কেমন কেমন হয়ে উঠলো! নায়করাজ নেই, এটা কখনও ভাবতে চাননি এফডিসির কেউ। এখানেই যে ‘অবুঝ মন’ নিয়ে ‘আলোর মিছিল’ জ্বালিয়েছিলেন তিনি।
ষাটের দশকের মাঝের দিক থেকে এফডিসিই ছিল রাজ্জাকের দীর্ঘদিনের কর্মস্থল। এখানকার কোথায়ইবা তার পা পড়েনি! সত্তরের দশকে এখানকার ফ্লোরগুলো চাঙা থাকতো তার সুবাদেই। নায়করাজের সিনেমার শুটিং হলো জমজমাট হতো ফ্লোরগুলো। দিনে দিনে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘পিচঢালা পথ’ পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশীয় চলচ্চিত্রের ‘রংবাজ’।
সারাজীবন চলচ্চিত্র নিয়েই থেকেছেন রাজ্জাক। অভিনয়ই নয়, এফডিসি তাকে পেয়েছে পরিচালক হিসেবেও। ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বদনাম’, ‘অভিযান’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘প্রফেসর’, ‘যোগাযোগ’, ‘সৎ ভাই’ পরিচালনা করে নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি।
সোমবার দুঃসংবাদ শোনার পর পরিচালক সমিতির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেলো, মনতাজুর রহমান আকবর সতীর্থ অনেককে জানাচ্ছেন। তার আরেক পাশে দেবাশীষ বিশ্বাস খবরটা শুনে নিস্তেজ হয়ে বসে আছেন।
ভেতরে বিষণ্ন মনে বসে আছেন আমজাদ হোসেনসহ বেশ কয়েকজন পরিচালক। রাজ্জাককে নিয়ে কথা বলতে বলতে তাদের গলা ভারী হয়ে আসে। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
গত বছর ৭৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এই ঘরটাতে এসেই রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমি এফডিসির হয়েই থাকবো।’ এরকম বিভিন্ন স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন কেউ। তারা নিজেদের অশ্রুসিক্ত চোখ মুছতে থাকেন।
রূপালি পর্দায় রাজ্জাককে ‘বাবা কেন চাকর’-এর মতো অনেক ছবিতে কাঁদতে দেখা গেছে। চরিত্রের প্রয়োজনে তাঁর সেই কান্না কাঁদিয়েছে দর্শকদের। কান্না কিংবা কমেডি, প্রেম কিংবা বলিষ্ঠ পুরুষের চরিত্রে এমন মানুষের অভিনয় আর দেখা যাবে না বলে এখন সতীর্থরা কাঁদছেন।
শুধু সতীর্থরাই নন, সারাদেশেই হয়তো ছড়িয়ে পড়েছে এই শোক। রাজ্জাক ভক্তদের চোখের কোণেও হয়তো জল জমেছে। ২১ আগস্ট ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তির অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে নায়করাজের মৃত্যু নেই, তিনি চিরকাল থেকে যাবেন সবার ‘জীবন থেকে নেয়া’!



