অনিন্দ্যসুন্দর মুখ, মূর্তিমতি লাবণ্য, সৌন্দর্য, আকর্ষণীয় শারীরিক গড়ন, ভুবন ভোলানো হাসি, দারুণ চাহনি ও অতুলনীয় অভিনয়ের সুবাদে কোটি কোটি দর্শকের মন কেড়েছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মহানায়িকা। আজ (৬ এপ্রিল) তার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল বাংলাদেশের বৃহত্তর পাবনার সিরাজগঞ্জ মহকুমার ভাঙাবাড়ি গ্রামে নানাবাড়িতে তার জন্ম। পর্দা-নাম সুচিত্রা সেন হলেও বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত আর মা ইন্দিরা দেবী মেয়ের নাম রেখেছিলেন রমা দাশগুপ্ত। পাবনার হেমসাগর লেনের বাড়িতে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। এ বাড়ির প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে রয়েছে তার স্মৃতি।
২০১৪ সালের ১৭ জুলাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে দখলমুক্ত করা হয় সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়িটি। তারপর থেকে অনেকটা অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছে বাড়িটি। গত বছর তার জন্মবার্ষিকীতে কিছু ছবি দিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা করা হলেও তাতে সন্তুষ্ট নন দর্শনার্থীরা। বাড়িটিতে পূর্ণাঙ্গ ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ’ গড়ে তোলার সরকারি উদ্যোগে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি নেই—এমন অভিযোগ তুলে হতাশ স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
ভারতীয় পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
কয়েক দিন আগে কলকাতা থেকে পাবনায় আসা কয়েকজন ভারতীয় পর্যটক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহানায়িকার বাড়িটি দেখার আশা ছিল অনেক দিনের। সেই আশা পূরণ হলো। কিন্তু দেখতে এসে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মনে হচ্ছে বাড়িটি অনেকদিন ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। বাড়ির সামনে ও ভেতরে ময়লা-আবর্জনা, বড় বড় ঘাস, লতাপাতায় ভরপুর। বিভিন্ন স্থানে ভঙ্গুর অবস্থা।’
কোথায় সেই প্রকল্প?
স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরার কথা লেখা থাকলেও ভেতরে কোথাও তা চোখে পড়েনি। একজন কেয়ারটেকার থাকলেও নারী দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। তাদের দাবি—‘বাড়িটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি আর্কাইভ হিসেবে আমরা দেখতে চাই। দীর্ঘদিন ধরে শুনছি সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কোথায় সেই প্রকল্প?’
নিউইয়র্কে সুচিত্রা সেন মেমোরিয়ালের চাওয়া
সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি উদ্ধার নিয়ে আন্দোলন শুধু পাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল সুদূর নিউইয়র্কেও। সেখানকার সুচিত্রা সেন মেমোরিয়ালের আহ্বায়ক গোপাল স্যানাল বলেন, ‘বাড়িটি উদ্ধার ও সেখানে স্মৃতি আর্কাইভ গড়ে তোলার দাবিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি নিউইয়র্কেও আন্দোলন করেছি আমরা। নিউইয়র্কে প্রতি বছর জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে মহানায়িকাকে স্মরণ করা হয়। প্রবাসী সব বাঙালির মনে জায়গা করে আছেন সুচিত্রা সেন। আমরা চাই বাড়িটি যেন এভাবে অবহেলায় নষ্ট হয়ে না যায়।’
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আশঙ্কা
সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ পাবনার সহ-সভাপতি ডা. রামদুলাল ভৌমিক বলেছেন, ‘বাড়িটিতে সুচিত্রা সেন স্মৃতি আর্কাইভ করতে প্রকল্প প্রস্তাবনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এর সঙ্গে দেশের আরও ১০টি স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি নিয়ে প্রকল্প যোগ হয়ে একটি প্যাকেজ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। কিন্তু কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে তা জানা নেই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পের কাজ যেন আটকে না যায় সেই প্রত্যাশা করি।’
পাবনাবাসীকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাড়িটিতে উন্নয়নের জন্য কিছু বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তারপরও বাড়িটিতে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা করার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি।’
দেশ-বিদেশে মহানায়িকার জন্মবার্ষিকী
মহানায়িকার জন্মবার্ষিকী উদযাপনে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে পাবনা জেলা প্রশাসন ও সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ। আর দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজা হলে সুচিত্রা সেন জন্মোৎসবের আয়োজন করেছে সুচিত্রা সেন মেমোরিয়াল।
এবং সুচিত্রা সেন
বাংলা ছবির এই মহানায়িকার জীবন স্বপ্নকাতর বাঙালির কাছে ছিল রূপকথা। তার চুল, চোখ, সাজগোজ ছিল বাঙালি মেয়েদের কাছে ফ্যাশনের সমার্থক। পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যেতে হয় তাকে। পরের বছর কলকাতার শিল্পপতি আদিনাথ সেন তনয় দিবানাথ সেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর পর তাদের ঘর আলো করেন একমাত্র মেয়ে মুনমুন সেন। সুচিত্রার দুই নাতনি রাইমা সেন ও রিয়া সেন।
১৯৫২ সালে ‘সুচিত্রা সেন’ নামে চলচ্চিত্রাঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন রমা সেন। বাংলা চলচ্চিত্র সম্ভারে তার অভিনীত ছবির সংখ্যা ৫৩। আর হিন্দিতে ৭। সব মিলিয়ে ৬০। তার অভিনীত প্রথম ছবি ‘শেষ কোথায়’ মুক্তি পায়নি। মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি ‘সাত নম্বর কয়েদি’। তার জয়যাত্রা শুরু হয় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৪) মুক্তির পর থেকে।
দর্শকের কাছে সুচিত্রা সেন ছিলেন অধরা স্বপ্নের রানী। এখনও তা-ই আছেন। এভাবেই অমর থেকে যাবেন চিরকাল। প্রায় ৩৬ বছর তিনি ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। কলকাতায় একাকী থাকতেন বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে। স্বেচ্ছা নির্বাসনে গিয়ে রহস্যময়ী ছিলেন আমৃত্যু। অনেকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ৮২ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান সবার মনের মহানায়িকা।



