প্রিমিয়ারের আগে নো আগাম প্রেস স্ক্রিনিং, নো সেলফি, নো নেটফ্লিক্স— এই তিন ‘না’ বিতর্কের ঢেউ বইয়ে দিচ্ছে সাগরপাড়ের শহর কানে।
বিতর্ক ছাড়া কি কান উৎসব হতে পারে? জন্ম থেকেই তো বিতর্ককে সঙ্গী করে চলছে এই আয়োজন। বিতর্ক আর কান হাঁটে হাতে হাত রেখে! এবারও বিতর্ককে সঙ্গে নিয়ে শুরু হচ্ছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এই উৎসব।
১৯৩২ সালে অ্যাডলফ হিটলার ও মুসোলিনির তত্ত্বাবধানে ইতালির ভেনিসে শুরু হয় বিশ্বের প্রাচীন চলচ্চিত্র উৎসব। এতে যুক্ত ছিল ফ্রান্সও। কিন্তু ফ্যাসিবাদ রাজত্ব থেকে মুক্ত হতে বেরিয়ে আসেন ফরাসিরা। এভাবেই ১৯৩৯ সালে শুরু হয় কান উৎসব। কিন্তু তিন দিন পরেই হিটলারের সৈন্যরা পোল্যান্ডে অভিযান শুরু করলে বন্ধ হয়ে যায় এই আয়োজন। ১৯৪৬ সালে আবারও শুরু হয় শৈল্পিক যাত্রা। সেই থেকে আর বিরতি পড়েনি উৎসবটিতে।
আজও বিতর্ককে কাঁধে নিয়ে চলছে কান। বিতর্কের সঙ্গেই যেন কানের সংসার! যেমন সাত বছর পর ডেনিশ পরিচালক লার্স ভন ট্রিয়ারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বিতর্ককে দাওয়াত দিয়ে এনেছে কান। ২০১১ সালে প্রতিযোগিতা বিভাগে ছিল তার ‘মেলানকোলিয়া’। এর সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নাৎসি উল্লেখ করা ও অ্যাডলফ হিটলারকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় কান উৎসবে নিষিদ্ধ হন তিনি। ৬১ বছর বয়সী এই নির্মাতার নতুন ছবি ‘দ্য হাউস দ্যাট জ্যাক বিল্ট’ দেখানো হবে প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে। এতে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডিলন ও উমা থারম্যান।
২০০০ সালে ‘ড্যান্সার ইন দ্য ডার্ক’ ছবির সুবাদে স্বর্ণ পাম জেতেন লার্স ভন ট্রিয়ার। গত বছরের অক্টোবরে আইসল্যান্ডিক গায়িকা বিওর্কের অভিযোগ ছিল, ‘ড্যান্সার ইন দ্য ডার্ক’-এর শুটিংয়ের সময় লার্স ভন ট্রিয়ার তাকে যৌন হয়রানি করেছেন। এ ছবিতে দারুণ অভিনয়ের জন্য ২০০০ সালে কানে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন তিনি।
কানের সঙ্গে যৌন হয়রানির বিতর্ক আরও আছে। এ উৎসব চলাকালে বিলাসবহুল একটি হোটেলে নিন্দিত হলিউড মোগল হার্ভি ওয়াইনস্টিন ধর্ষণ করেছিলেন বলে অভিযোগ ইতালিয়ান অভিনেত্রী এশিয়া আর্জেন্টোর। এজন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হটলাইন চালু করছে কান। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মিটু হ্যাশট্যাগ আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে তাই কানেও।
নো নেটফ্লিক্স, নো সেলফি, নো প্রবলেম!
গত বছর অনলাইননির্ভর মার্কিন বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্স প্রযোজিত দুটি ছবি (‘ওকজা’, ‘দ্য মেয়ারোউইৎজ স্টোরিস) প্রতিযোগিতা বিভাগে রেখে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল কান। ফ্রান্সের প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা এর তীব্র বিরোধিতা করে। কারণ, দেশটির আইন অনুযায়ী সিনেমা হলে মুক্তির ৩৬ মাস পর্যন্ত অনলাইনে উন্মুক্ত করা যায় না কোনও ছবি। তাছাড়া কানে গতবার দেখানো তাদের প্রযোজিত দুটি ছবির একটিও রুপালি পর্দায় মুক্তি পায়নি।
এসব কারণে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো নেটফ্লিক্সকে প্রতিযোগিতার বাইরে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে শেষ মুহূর্তে উৎসব বর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও এ ঘটনায় অনুতপ্ত নেটফ্লিক্সের সিইও রিড হ্যাসটিংস। তিনি স্বীকার করেছেন, কান বর্জনের পদক্ষেপ ছিল ভুল। তাই অকপটে ক্ষমা চেয়েছেন। কান উৎসবের সঙ্গে ভবিষ্যতে কীভাবে যুক্ত থাকা যায় তা নিয়ে দুইপক্ষ ভেবে দেখছে বলেও জানান তিনি।
কান ও নেটফ্লিক্স দ্বন্দ্বে এবারের আসর থেকে বাদ পড়েছে আলফনসো কুয়ারনের ‘রোমা’, পল গ্রিনগ্রাসের ‘নরওয়ে’, জেরেমি সলনিয়ারের ‘হোল্ড দ্য ডার্ক’, ওরসন ওয়েলেসের ‘দ্য আদার সাইড অব দ্য উইন্ড’ ও ওয়েলেসের ওপর নির্মিত মর্গ্যান নেভিলের ‘দে উইল লাভ মি হোয়েন আই অ্যাম ডেড’।
কানের লালগালিচায় সেলফির ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপক। যদিও থিয়েরি ফ্রেমোর দাবি, তিন বছর আগেও কেউ সেলফি তুলতো না। ফলে এই নিষেধ তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন তিনি। প্রিমিয়ারের আগে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা এড়াতেই এমন সিদ্ধান্ত আয়োজকদের। তার চোখে ‘সেলফি হাস্যকর ও উদ্ভট! সেলফি তোলার মতো মামুলি বিষয়ের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গোটা উৎসবে।'
সমাপনী ছবির জন্য আদালতে
উৎসবের সমাপনী ছবি ‘দ্য ম্যান হু কিল্ড ডন কিহোটে’ আদতে কানে দেখানো যাবে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ছবিটির মুক্তি বন্ধের জন্য আদালতে আবেদন করেছে প্যারিসের আলফামা ফিল্মস প্রোডাকশন। তাদের দাবি, ‘ডন কিহোটে’ উপন্যাস অবলম্বনে ছবি নির্মাণের স্বত্ব তাদের।
সোমবার (৭ মে) এই আবেদনের শুনানি হয়েছে। তবে আদালত চূড়ান্ত রায় দেবেন ৯ মে। আইনি বাধা পেরোতে পারলে আগামী ১৯ মে কানের সমাপনী অনুষ্ঠানের পর দেখানো হবে এটি। একই দিন ফ্রান্সের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘দ্য ম্যান হু কিল্ড ডন কিহোটে’।
সপ্তদশ শতকে প্রকাশিত মিগেল দে ভান্তেসের স্প্যানিশ উপন্যাস ‘ডন কিহোটে’ রুপালি পর্দায় তুলে আনতে ২০০০ সালে কাজ শুরু করেছিলেন টেরি গিলিয়াম। ১৭ বছর ধরে আটবার চেষ্টার পর অবশেষে ছবিটির কাজ শেষ করতে পেরেছেন তিনি। এতে অভিনয় করেছেন অ্যাডাম ড্রাইভার, জনাথান প্রাইস ও জেমস বন্ড সিরিজের অভিনেত্রী ওলগা কুরিলেঙ্কো।
সাংবাদিকদের বেলায় আমূল পরিবর্তন
উৎসবের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সময়সূচিতে সাংবাদিকদের বেলায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগেভাগে দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে গণমাধ্যমের নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে কোনও ছবির সর্বনাশ যেন না হয়, তাই এই ব্যবস্থা। অন্যান্যবার সাংবাদিকদের দেখানোর কয়েক ঘণ্টা পর গালা স্ক্রিনিং হতো। কিন্তু এবার সবাইকে তা দেখতে হবে একই সময়ে। এটাকেই সত্যিকারের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হিসেবে দেখছেন আয়োজকরা।
নিষিদ্ধ দুই পরিচালকের ছবি
প্রতিযোগিতা বিভাগে এবার স্থান পাওয়া ২১টি ছবির মধ্যে আলাদাভাবে আলোচিত হচ্ছে ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহির ‘থ্রি ফেসেস’ ও রাশিয়ার কিরিল সেরেব্রেনিকভের ‘লেটো’। কারণ, উভয়ে নিজ নিজ দেশে গৃহবন্দি।
চলচ্চিত্র নির্মাণে ২০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে তেহরানে গৃহবন্দি আছেন পানাহি। অন্যদিকে সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে গৃহবন্দি সেরেব্রেনিকভ। দুজনের কেউই কান উৎসবে নিজেদের ছবির পক্ষে কথা বলতে সশরীরের হাজির থাকতে পারছেন না। তবুও আশা ছাড়েননি আয়োজকরা। ফ্রান্স সরকারের মাধ্যমে ইরান ও রাশিয়ায় আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন তারা।
নিষিদ্ধ ছবিকে স্বাগতম
কান উৎসবের আঁ সার্তেন রিগার্দ বিভাগে প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত কেনিয়ার নারী পরিচালক ওয়ানুরি কাহিয়ুর ‘রাফিকি’ নিজ দেশেই নিষিদ্ধ হয়েছে। কারণ, এতে তুলে ধরা হয়েছে সমকামী দুই নারীর প্রেমের গল্প।
‘রাফিকি’ শব্দের অর্থ বন্ধু। ২০০৭ সালে প্রকাশিত উগান্ডার কথাশিল্পী মনিকা আরাক ডিনাইকোর ছোটগল্প ‘জাম্বুল ট্রি’ অবলম্বনে সাজানো হয়েছে এর চিত্রনাট্য। বয়ঃসন্ধিতে পড়া দুই তরুণীকে ঘিরে ছবির গল্প। দুই পরিবারে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিরোধিতা থাকলেও তারা একে অপরের প্রেমে পড়ে। রক্ষণশীল সমাজেও নিজেদের পরিচয় আর স্বপ্ন খুঁজে বেড়ায় তারা। কেনিয়ার কোনও ছবির কানে আমন্ত্রণ পাওয়ার ঘটনা আর নেই। কিন্তু কেনিয়া ফিল্ম ক্ল্যাসিফিকেশন বোর্ড টুইটারে মনে করিয়ে দিয়েছে আইনের কথা। সেখানে সমকামিতার দায়ে ১৪ বছরের জেল হয়।







