কান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র পালে দো ফেস্টিভ্যাল তৃতীয় তলায় সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢুকে অবাক হতে হলো। মঞ্চে একা বসে আছেন ফরাসি চলচ্চিত্র সমালোচক জেরার্ড লেফো। তিনিই সভাপতিত্ব করবেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে সাধারণত এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একাই থাকতে হয়। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, তিনি ছাড়া আর কারও নাম উল্লেখ নেই মঞ্চের টেবিলে।
শনিবার (১২ মে) সকাল ১১টায় ষাটের দশকের ফ্রেঞ্চ নিউওয়েভের রূপকার জ্যঁ-লুক গদারের নতুন সৃষ্টি 'দ্য ইমেজ বুক' নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ৮৭ বছর বয়সী এই গুণী নির্মাতার এখানে আসার মতো শারীরিক পরিস্থিতি নেই। শুক্রবার স্বর্ণ পামের লড়াইয়ে থাকা ছবিটির প্রদর্শনীর আগে লালগালিচায় তার অনুপস্থিতি জানিয়ে দিয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনেও থাকছেন না তিনি। তবুও আয়োজকরা কীভাবে কী করেন তা দেখার কৌতূহল থেকে সেখানে গিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলো সবাই।
মঞ্চের সামনে রাখা হয়েছে মাইক্রোফোন। সেখানে পালাক্রমে এসে ফরাসি-সুইস নির্মাতা গদারকে প্রশ্ন করতে লাইন ধরেছেন সাংবাদিকরা। 'দ্য ইমেজ বুক' ছবির চিত্রনাট্যকার ফ্যাব্রিস আরেগনো মোবাইল ফোনে ফেসটাইমে কল করে তাদের যোগাযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছেন। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন কানের ইতিহাসে আগে কখনও ঘটেনি। এ এক দুর্লভ মুহূর্ত। গদার বলে কথা! পুরো ব্যাপারটাই অভিনব।
ফেসটাইমে গদারকে দেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ প্রচারবিমুখ হিসেবে তাকে জানে সবাই। তাই আইফোনের সহায়তায় ভিডিও কনফারেন্সে এসে সবাইকে চমকে দিলেন তিনি। কেউ ইংরেজিতে প্রশ্ন করলে আরেকজন মাইক্রোফোনের সামনে এসে মোবাইল ফোনে গদারের দিকে তাকিয়ে তা ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করে দিচ্ছেন। এভাবে সংবাদ সম্মেলন হচ্ছে বলে তার সরস মন্তব্য, 'মেশিন গান থেকে গুলিবর্ষণের মতো লাগছে কিছুটা!' রাশিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'আমাদের সদয় হতে হবে।'
২০০৪ সালে কানের মূল প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত নিজের ছবি 'আওয়ার মিউজিক'-এর সংবাদ সম্মেলনেও অন্যরকম কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন গদার। সেই সময় ফরাসি অভিনয়শিল্পী ও টেকনিশিয়ান সংঘের একজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানান তিনি। ওই ব্যক্তি ফ্রান্স সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে হাজির থাকলেও টু শব্দটি করেননি গদার।
গদারকে ধরা হয়ে থাকে কানের বাঘা নির্মাতা। ফরাসি উপকূলে তার মর্যাদার কতটা সেই প্রমাণ মিলেছে কানের ৭১তম আসরের অফিসিয়াল পোস্টারে। গদারের বিখ্যাত ছবির তালিকায় থাকা 'পিয়েরো দ্য ম্যাডম্যান' (১৯৬৫) ছবির একটি দৃশ্য নিয়ে এটি সাজানো হয়েছে।
যদিও উৎসবটির আয়োজকদের সঙ্গে তার বৈরী সম্পর্ক। ঠিক ৫০ বছর আগে ১৯৬৮ সালে কান উৎসব বাতিল হওয়ার পেছনে ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সঙ্গে মিলে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তখন ফ্রান্স জুড়ে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের প্রতিবাদের সঙ্গে সংহতি দেখানোর ডাক দিয়েছিলেন তিনি।
‘দ্য ইমেজ বুক’ সিনেমা নির্মাণের প্রচলিত ধারার অনেক কিছু ভেঙেছে। এতে নেই কোনও অভিনয়শিল্পী। কোনও দৃশ্যের শুটিংও হয়নি। অন্যান্য ছবির ক্লিপস, স্থিরচিত্র, সংবাদের ফুটেজ ও জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের অনলাইন ভিডিওর সঙ্গে সংগীতের সম্মিলন ঘটানো হয়েছে এতে। হলিউডের বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতা মাইকেল বে প্রযোজিত 'থার্টিন আওয়ারস: দ্য সিক্রেট সোলজার্স অব বেনগাজি'র দৃশ্যও দেখা যায় ক্ষণিকের জন্য।
সিনেমায় বরাবরই নিরীক্ষা করে আসছেন গদার। এর ধারাবর্ণনায় তার কণ্ঠই শোনা যায়। নিজের নতুন সিনেমা প্রবন্ধ নিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমি দেখাতে চেয়েছি, আরবদের সত্যিই অন্য কারও সহায়তা প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরাই সব করতে পারে।'
ভবিষ্যতের সিনেমা প্রসঙ্গে গদারের ভাষ্য, ‘চারপাশে যা ঘটছে, ফেসবুকে প্রতিদিন দর্শক যা দেখে তা সিনেমায় দেখানো উচিত নয়। যা ঘটে না বা ফেসবুকে দেখা যায় না এমন কিছু দেখানো উচিত আমাদের।’
নিজের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে আশাবাদী গদার। আরেকটি চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘অবশ্যই! যদি আমি পারি। তবে এটা আমার ওপর নির্ভর করে না। আমার পা, আমার হাত ও কিছুটা আমার চোখের ওপর নির্ভর করে।’
এক ঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ফেসটাইমে কল কেটে দেওয়ার আগে হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন গদার। সাংবাদিকরা আন্তরিকভাবে তার প্রশংসা করেন। তাদের কেউ কেউ এমন উদ্যোগকে বললেন, ‘গদারজিয়ান’!







