বিশ্বব্যাপী ব্যান্ড মানেই ভাঙা আর গড়ার গল্প। যদিও সেই গল্পগুলো ভাঙাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বাংলাদেশে। এখানে ভেঙে আবার গড়ে ওঠার রেকর্ড প্রায় শূন্য। বিপরীতে যে দুই একটি ব্যান্ড ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, তাদের অবস্থাও অনুল্লেখযোগ্য।
এসব বিচারে গেল ৪০ বছরের ট্র্যাক রেকর্ডে সম্ভবত ‘মাইলস’-ই অন্যতম, যার সদস্যরা নিজেদের অটুট রেখেছেন ‘অ্যাজ আ কমপ্লিট ব্যান্ড’ হিসেবে। মাঝে মাঝে দলটিতে ফাটল ধরার সম্ভাবনা দেখা দিলেও, দ্রুত সময়ে সেটি সামলেও উঠেছেন এর বিজ্ঞ সদস্যরা। আরেকটি বিষয়, একই লাইনআপ নিয়ে এত দীর্ঘ সময়, খুব কম ব্যান্ডই আছে, যারা পথ চলছে একসঙ্গে। এই বিশ্লেষণ গোটা বিশ্বের ব্যান্ড ইতিহাসের জন্যই প্রযোজ্য।
মূলত তারই প্রতিধ্বনি অথবা প্রতিচ্ছবি মিলেছে ২৪ ডিসেম্বর রাতে, বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের রাজদর্শন মঞ্চে। গানে গানে আবারও এই দলটি শ্রোতাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদের নামের মতো করেই, ‘আমরা এভাবেই আপনাদের প্রীত করে যাবো গানে গানে মাইলের পর মাইল সময়ের পথ ধরে।’
জন্মের ৪০ বছর পেরিয়েও প্রাণবন্ত মাইলস সদস্যরা প্রত্যয় ব্যক্ত করলো এভাবে, ‘সংগীত হলো সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি ফসল। আমরা শুরু থেকে আজও সেই চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছি।’
মঙ্গলবার শীতসন্ধ্যায় বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের রাজদর্শন হলে চার দশক বয়সী মাইলসকে নতুনভাবে চিনলেন ভক্তরা। একই মঞ্চে মাইলস সদস্যদের ভালোবাসা জানাতে শুভেচ্ছা গান পরিবেশন করে ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ, দলছুট ও ভাইকিংস।
আয়োজনের শুরুতে মাইলস-এর গান ‘শান্তি চাই’ পরিবেশন করে ভাইকিংস। এরপর মঞ্চে ওঠেন মাইলসের জনপ্রিয় গানের গীতিকারেরা। তারা শোনান ব্যান্ডটির গান লেখা ও তৈরির পেছনের নানা কথা। গীতিকবি লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ‘৪০ বছর পার করা একটি ব্যান্ডের জন্য অনেক দীর্ঘসময় এবং ব্যাপক সফলতার একটি বিষয়। সেটা করে দেখিয়েছে মাইলস। আমি তাদের আরও সফলতা কামনা করি।’
এরপর অনুষ্ঠান সঞ্চালক আজরা মাহমুদ মঞ্চে ডেকে নেন ব্যান্ডদল ‘ওয়ারফেজ’ সদস্যদের। মাইলসকে ট্রিবিউট করে তারা গেয়ে শোনায় ‘শেষ ঠিকানা’ গানটি। এরপর সোলস, দলছুট ও ফিডব্যাকের একটি করে পরিবেশনা মুগ্ধ করে দর্শকদের।
এরপরই আসে উপস্থিত শ্রোতাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মঞ্চে ওঠে মাইলস। চিরচেনা ভঙ্গিতে দলপ্রধান হামিন আহমেদ বলে ওঠেন ‘ইটস মাইলস টাইম’! এরপরই শাফিন আহমেদ গেয়ে ওঠেন ‘পাহাড়ি মেয়ে’। পুরো অডিটোরিয়াম কণ্ঠ মেলায় তাতে। এরপর একে একে তারা শোনান ‘সুপ্ত বাসনা’, ‘প্রিয়তমা’, ‘কী জাদু’ ও ‘চাঁদতারা’।
এরপর মঞ্চে ওঠেন তিনজন মাইলস-ভক্ত। যারা মাইলসের ‘নীলা তুমি কি জানো না’ গানের প্রতিযোগিতায় সেরা বিজয়ী হয়েছেন। মাইলসের সঙ্গে মঞ্চে সেই গানটি গেয়ে শোনান তারা। দর্শক অনুরোধে পরে আবার সেটি গেয়ে শোনান হামিন আহমেদ।
মাইলস-এর চার দশকের এই উদযাপন শুরু হয়েছে গত ২১ জুন। উদ্দেশ্য দলটির ৪০ বছর উদযাপনের কনসার্টে অংশ নেওয়া। একে একে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ২৮টি কনসার্ট করে তারা। যার পর্দা নামে ২৪ ডিসেম্বর উইন্ডমিল-এর আয়োজনে ঢাকার এই মেগা কনসার্টের মাধ্যমে।
১৯৭৯ সালে মাইলস-এর শুরুটা হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক হোটেল শেরাটন)-এ ইংরেজি গান পরিবেশনার মাধ্যমে।
১৯৮২ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম বের হয় ইংরেজি ভাষায়। ওই সময় কিছু লোক বলেছিল, মাইলস বাংলা গান রচনা করতে পারে না! মূলত এমন কথার জবাব দিতে গিয়েই মাইলস তাদের প্রথম বাংলা অ্যালবাম প্রকাশ করে। অ্যালবামটির নাম ‘প্রতিশ্রুতি’। ‘চাঁদ তারা’সহ অ্যালবামটির প্রতিটি গান তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি দলটিকে। যে অ্যালবামই বের করেছেন, সেটিই সুপারহিট। শুধু বাংলাদেশেই নয়, গানগুলো সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও।
মাইলস-এর অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে—মাইলস (ইংরেজি-১৯৮২), প্রতিশ্রুতি (১৯৯১), প্রত্যাশা (১৯৯৩), প্রত্যয় (১৯৯৬), প্রয়াস (১৯৯৭), প্রবাহ (২০০০), প্রতিধ্বনি (২০০৬), প্রতিচ্ছবি (২০১৫) ও প্রবর্তন (২০১৬)।
বর্তমানে মাইলসের সদস্য পাঁচজন। গেল প্রায় ২০ বছর ধরেই যারা আছেন একসঙ্গে। তারা হলেন শাফিন আহমেদ, হামিন আহমেদ, মানাম আহমেদ, সৈয়দ জিয়াউর রহমান তূর্য ও ইকবাল আসিফ জুয়েল। এরমধ্যে হামিন আহমেদ, মানাম আহমেদ ও শাফিন আহমেদ শুরু থেকেই দলের সঙ্গে আছেন।



