‘বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণায় অনেকে টিভি রেখে ইউটিউবে ঝুঁকেছে। সেখানেও এখন একই অবস্থা!’ একজন দর্শকের মন্তব্য এটা! ঠিক উল্টো মন্তব্যও আছে। ‘ঈদের সাত দিন শেষ! যাক এবার আলোচিত নাটকগুলো দেখতে বসবো!’
দুটি মন্তব্যই নেওয়া ফেসবুক পোস্ট থেকে। প্রথম মন্তব্যকারী জানান, তিনি নিয়মিত ইউটিউবে নাটক বা কন্টেন্ট দেখেন। তবে টিভির মতো সেখানেও ক্রমশ বিজ্ঞাপনের ঢেউ বাড়ছে। সুবিধা হলো, কিছু কিছু বিজ্ঞাপন এড়িয়ে যাওয়া যায় স্কিপ অপশনে গিয়ে। তাই টিভির চেয়ে এখনও বড় ইউটিউবটাই ভরসার জায়গা।
শুধু ইউটিউব নয়, এই করোনাকালে ফেসবুক বা ভিডিও স্ট্রিমিং সাইট নেটফ্লিক্স, বিঞ্জ, জি-ফাইভ, হইচইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতেও বুঁদ হয়ে আছেন ঘরবন্দি দর্শকরা।
তাহলে কি অনলাইনের মাধ্যমগুলোর কাছে প্রেক্ষাগৃহ বা টিভির মতো মূলধারার মাধ্যম ধরাশায়ী হচ্ছে—প্রশ্নটি করা হয়েছিল সাম্প্রতিক বহু নাটকের জনপ্রিয় নির্মাতা কাজল আরেফিন অমির কাছে। তার বক্তব্য, ‘এটা মোটেও নয়। সিনেমার টেস্ট কখনোই টিভি বা ইউটিউবে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অনলাইনের কাছে প্রেক্ষাগৃহ কখনোই মার খাবে না। কিন্তু টিভি ও ইউটিউব প্রায় একই বাক্স। একটা বাক্স আমাকে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে, আরেকটা তুলনামূলক দেখাচ্ছে না। আবার এ দেশে সবার হাতে কিন্তু স্মার্টফোন নেই। থাকলেও ইন্টারনেট সুবিধা নেই। তাই যদি ধরেও নিই অনেকে এখন ফেসবুক-ইউটিউব দেখছেন, কিন্তু সেটা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি নয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে টিভিটাই এখনও বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। আবার দেখুন টিভিতে যে কনটেন্ট আপনি দেখছেন সেটাই দেওয়া হচ্ছে ইউটিউবে। মানে টাকা দিয়ে সেটা দেখতে হচ্ছে। একটা ভালো নাটকে ইউটিউব গড় ভিউ যদি ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ ধরি, মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা বেশি নয়। তাই ইউটিউব বা ফেসবুক আলাদা একটি মাধ্যম হিসেবে এগুচ্ছে। যেখানেও একশ্রেণির দর্শক সময় কাটাচ্ছেন। তবে সেগুলো টেলিভিশন বা সিনেমা হলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। বলা যায়, আমাদের মাধ্যমগুলো আরও বিস্তৃত হচ্ছে।’
টেলিভিশন বা সিনেমা হল অনলাইনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত সেভাবে না হলেও অর্থনৈতিকভাবে টেলিভিশন কিছু পিছিয়ে যাচ্ছে এটাও স্বীকার করলেন এই নির্মাতা। কারণ, বিজ্ঞাপনগুলো ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক একই বিষয়টি সামনে আনলেন দেশটিভির অনুষ্ঠান প্রধান রবিউল করিম।
তার মতে, ‘যে বিজ্ঞাপনটি টেলিভিশনের পাওয়ার কথা ছিল সেটির অর্থ এখন ইউটিউব বা ফেসবুকের জন্য রাখা হচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে টেলিভিশন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই জায়গাটায় তারা ভাগ বসিয়ে ফেলেছে। আর এই করোনায় অনলাইনগুলো এগিয়ে গেছে। কারণ, নির্মাণের অভাবে আমাদের নতুন অনুষ্ঠান তেমন নেই।’
অন্যদিকে টিভি চ্যানেল ও সিনেমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় প্রত্যেকেরই ইউটিউব চ্যানেল বা ফেসবুক পেজ আছে। তারা সেখান থেকেও ‘হাতছাড়া’ হওয়া বিজ্ঞাপনের টাকা তুলতে পারছেন বলে অনেকেই মনে করেন।
সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম আলোচিত ও প্রশংসিত ছবি ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর নির্মাতা দীপংকর দীপন। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এখন পরিচিত হলেও একটা সময় একটি বেসরকারি টিভির অনুষ্ঠান প্রধান ছিলেন। এছাড়াও কাজ করছেন অনলাইন প্রশিক্ষক হিসেবে। নির্মাণ করেছেন অসংখ্য নাটকে। ফলে তার দেখার চোখ আরও তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা।
‘পুরো বিষয়টি যদি আমরা দেখি, আগে পর্যবেক্ষণটা আলাদা ছিল। মানে করোনার আগে। ইউটিউবও এগুচ্ছিল, আবার টিভি চ্যানেল বা সিনেমা হলগুলোও এগুচ্ছিল। কিন্তু এই করোনার ৫-৬ মাস এগিয়ে দিয়েছে ইউটিউবকে। করোনার এই সময়ে যখন সিনেমাটা বন্ধ হয়ে গেল তখন ইউটিউব একমাত্র জায়গা হয়ে গেলে সিনেমার। টেলিভিশনও নতুন অনুষ্ঠান করেনি। তাই বিজ্ঞাপনও কমেছে। কিন্তু ইউটিউব তার জায়গায় একই আছে। বরং দর্শক সেখানে বেড়ে গেছে।’
বলছিলেন দীপংকর দীপন। তিনি মনে করেন ইউটিউব বা ফেসবুকের ক্ষেত্র ও স্বাদ আলাদা। তাই এগুলোতেও দর্শক তৈরি হতে থাকবে। ক্রমশ বাড়বে।
‘আমি একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মেন্টর। এই পুরো বিষয়টি আমি শিখেছি ইউটিউবে। আবার অনলাইনে সবাইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ইউটিউবের এই জিনিসটি ইউনিক। গুগল সার্চ ইঞ্জিনের পর সবচেয়ে বেশি জিনিস সার্চ দেওয়া হয় ইউটিউবে। যে বিষয়গুলো সিলেবাসের বাইরে, সবই পাওয়া যায় ইউটিউবে। তাই করোনা পার হয়ে গেলেও গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের গুরুত্ব কমার সুযোগ নেই। প্যারালালি ভূমিকা রেখে চলবে সিনেমা ও টেলিভিশন।’
এদিকে শুধু নাটক-সিনেমাই নয়, দেশীয় গানবাজারের প্রায় ৯০ ভাগই এখন ইউটিউবের দখলে। অডিও-ভিডিও যাই হোক, গান প্রকাশ মানে ইউটিউবে উন্মুক্ত হওয়া। পাশাপাশি অন্য মিউজিক অ্যাপেও সেগুলো প্রকাশ হয়, তবে প্রযোজক, শিল্পী ও শ্রোতাদের কাছে ইউটিউবটাই প্রথম আগ্রহের বিষয়।
অন্যদিকে নাটক, গান আর সিনেমার বাইরেও অন্তর্জালে গড়ে উঠেছে বিনোদনের নানা মাধ্যম। যার অন্যতম হলো টিকটক। অনেকেই চলতি প্রজন্মের টিনএজারদের ‘টিকটক জেনারেশন’ বলে অভিহিত করেন। শুধু তা-ই নয়, একাধিক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, যে কোনও গান হিট বা আলোচনায় আনার জন্য এখন টিকটক বড় ভূমিকা পালন করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংগীতশিল্পী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন টিকটক বিষয়টাকে অনেকে প্রফেশন হিসেবেও নিয়েছে। এর পেছনে অনেক বড় বড় তরুণ গ্রুপ রয়েছে। বিশেষ করে নতুন কোনও গান প্রকাশ হলে সেটির উল্লেখযোগ্য অংশ টিকটকের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। এবং এর বিনিময়ে ভালো অংকের টাকাও দিতে হয় সংশ্লিষ্ট গ্রুপকে।’
অনেকেই জানেন, টিকটক সাধারণত হয় নাটক, সিনেমা ও গান থেকে নেওয়া মজার মজার সংলাপ, অ্যাক্সপ্রেশন বা গানের ক্ষেত্রে ব্রিজলাইনের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে। খুব সহজে বড় প্রচারণার জন্য এখন সেই বিষয়টিকেই বেছে নিয়েছেন শিল্পী-প্রযোজকরা। কারণ, মানুষ ধরে নেয় টিকটক মানেই হিট বা ভাইরাল ইস্যু! পার্থক্য এটুকু, আগে সত্যিকারের গান বা ডায়লগ হিট হলে সেটি টিকটকের মাধ্যমে ভাইরাল হতো। আর এখন ভাইরাল বা হিট করানোর জন্য টিকটক করানো হয়!
জানা গেছে, টিকটক যখন থেকে (গেল বছর থেকে) শুধুই বিনোদন-মাধ্যমকে ছাপিয়ে প্রচারণার অন্যতম ফাঁদে পরিণত হলো তখন থেকেই এটিকে ঘিরে শুরু হলো নানা গ্রুপের প্রতিযোগিতা। অভিযোগ রয়েছে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং সৃষ্টিও এই টিকটক কালচারের সূত্র ধরে। কারণ, এটি এখন টাকা উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে একশ্রেণির টিনএজারদের মধ্যে।
বলে রাখা দরকার, চিত্রনায়িকা পূর্ণিমাসহ দেশ ও বিদেশের অসংখ্য তারকা শিল্পী এই টিকটক করে নতুন জীবন পেয়েছেন জনপ্রিয়তা ইস্যুতে!







