X
শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২
১৮ আষাঢ় ১৪২৯
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব এক

অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১২:৪২

আওধের নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। গান সাহিত্যে তথা শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁর পরিচিতি তখন সারা ভারতে। নিজে সেতার শিখেছিলেন ওস্তাদ কুতুব আলী খানের কাছে। সানাই, এসরাজ, সুরবাহার প্রসঙ্গেও তাঁর নাম এসে যায়। কত্থক নিয়ে লিখেছেন সচিত্র বই ‘মুসাম্মি কি বানি’।

নবাব হওয়ার আগে ১৮৪৩ সালে তিনি স্বরচিত ‘রাধা কানহাইয়া কি কিসসা’ নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। গানে, নাটকে, নৃত্য ও সাহিত্যে তুমুল উৎসাহী নবাব লখনৌর সাংস্কৃতিক জগৎকে আলোময় আর প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন।

১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁর রাজত্ব কেড়ে নেন। নির্বাসনে পাঠান কলকাতায়। তবে ব্রিটিশ সরকার তাঁর জন্য বিপুল পরিমাণ পেনশনের ব্যবস্থা করেন। সেই পেনশনের টাকা দিয়েই তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজে গড়ে তুললেন এক টুকরো ছোট লখনৌ। সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবি গায়ক নৃত্যশিল্পী বাদকের অন্যতম গন্তব্য ছিল মেটিয়াবুরুজ।

ওয়াজিদ আলি শাহর এই আস্তানায় একদিন ১০ বছরের কন্যা গওহরকে নিয়ে হাজির হন মা মালকা। নবাবের দরবারে মালকাকে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম সুযোগেই তিনি গেয়েছিলেন নবাবেরই সৃষ্ট গান, ‘বাবুল মোরা নইহার ছুটো হি যায়ে..’ ও ‘যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী’। সেদিনই তিনি নবাবের সভা-গায়ক হিসেবে নিযুক্ত হন। গানে তার সঙ্গে সঙ্গত করেছিলেন গওহর। মজলিসে উপস্থিত ছিলেন লখনৌ ঘরানার কিংবদন্তি কত্থক শিল্পী পণ্ডিত বিন্দাদিন মহারাজ। তিনি নবাবের কত্থকের গুরু পণ্ডিত ঠাকুর প্রসাদের পুত্র। শিশু গওহরের নাচের প্রতিভা দেখে তিনি মুগ্ধ হন। মালকার কাছে গওহরকে নাচ শেখানোর জন্য চেয়ে নেন। মালকার জন্য হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা।

নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ও গওহর জান ১৮৮৩ সালে, এইভাবেই শুরু হয় গওহরের উচ্চস্তরের শিক্ষা। লখনৌ ঘরানার বিন্দাদিন মহারাজের কাছে গওহরের কত্থক ও ঠুমরির তালিম শুরু হয়। মালকা তাঁর মেয়ের সংগীতের উৎকর্ষতার জন্য নতুন নতুন পথের সন্ধানে ছিলেন। তাই কত্থক ও ঠুমরির তালিমের পাশাপাশি পঞ্চকোটের মহারাজের সভা-গায়ক রামচরণ ভট্টাচার্যের কাছে গওহরের বাংলা গানের তালিম নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। রমেশচন্দ্র দাস বাবাজির কাছে গওহর বাংলা পদাবলি ও কীর্তন শিখেন। শ্রীজান বাঈয়ের কাছে ধ্রুপদে ধামারের তালিম নেন। ডি সিলভা নামক এক ফিরিঙ্গি মহিলা গওহরকে ইংরেজি ভাষা এবং ইংরেজি গান শেখান।

উর্দু, আরবি ও পার্সিয়ান ভাষায় গান ও শায়েরি রচনার শিক্ষা মালকা নিজেই তার মেয়েকে দিয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর দ্বারভাঙ্গা রাজদরবারের নিমন্ত্রণে মালকা যাননি। গেলেন ১৫ বছর বয়সের গওহর। তিনি গান গেয়ে মহারাজা লক্ষমেশ্বর সিং বাহাদুর এবং অন্যদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। সেদিনই তাঁকে দ্বারভাঙ্গার সভা-গায়ক এবং ‘জান’ উপাধি দেওয়া হয়। সেদিন থেকে গওহর হয়েছিলেন গওহর জান।

১৮৮০-র দশকের শেষের দিকে মাত্র ১৫ বছর বয়সে গওহরের মঞ্চ অভিষেক। তারপর জলসায়, রাজসভায়, সমাবেশে গান পরিবেশনের ব্যাপক ব্যস্ততা শুরু হয়। কিন্তু তখনও নামের সঙ্গে সুপার স্টার শব্দটি যোগ হয়নি।

১৯০২ সালে, কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানির প্রথম রেকর্ড গওহরের কণ্ঠে প্রকাশ হয়। এবং এরপর থেকে তাঁর গানের রেকর্ড নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। প্রায় প্রতিটি রেকর্ডের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যা সংগীত মহল থেকে শুরু করে সবার জন্য ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা।

গওহর জানের নামের সঙ্গেই মহিলা সুপার স্টার শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। তিনিই উপমহাদেশে সংগীতে প্রথম মহিলা সুপার স্টার।

২৬ জুন ১৮৭৩ সালে ভারতের আজমগড়ে এক ইহুদি পরিবারে গওহর জানের জন্ম।

গওহর জান

বাবা মায়ের দেওয়া নাম ছিল অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড। তাঁর দাদি ছিলেন হিন্দু, দাদা ব্রিটিশ। বাবা রবার্ট ইয়ার্ড ছিলেন বরফকলের ইঞ্জিনিয়ার। গওহরের মা ভিক্টোরিয়া হেমিংস ব্রিটিশ পরিবারভুক্ত ছিলেন। তবে তিনি ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। অ্যাঞ্জেলিনার শিশু বয়সেই তাঁর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ভিক্টোরিয়া শিশু অ্যাঞ্জেলিনাকে নিয়ে বেনারসে চলে আসেন এবং সেখানে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

গওহরের বয়স যখন ১০, তখন তিনি তাকে নিয়ে তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় চলে আসেন।

জলসা বা সংগীতানুষ্ঠানে সমবেত শ্রোতাদের মাতৃভাষা অনুযায়ী গওহর গান শোনাতেন। যেমন বাঙালি শ্রোতা পেলে বাংলা গান শোনাতেন। উর্দু ভাষাভাষীর লোক থাকলে উর্দু গান শোনাতেন। সমাবেশে উভয় ভাষার লোক উপস্থিত হলে তিনি উভয় ভাষায় গান শোনাতেন। তাঁর মা মালকাও ছিলেন কবি। তাঁর লেখা বাংলা গানও জলসায় গাইতেন। গাওয়ার তালিকায় রবীন্দ্রসংগীতও থাকতো।

ক্রমে ক্রমে গওহরের খ্যাতি সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর চালচলনে রাজকীয় একটা ভাব ছিল। টাকা ওড়াতেন ইচ্ছেমতো। আয় করতেন প্রচুর।

সেই সময় সাধারণ মানুষের ঘোড়ার গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ ছিল। গওহর জান চার ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে প্রায় বের হতেন। এবং এজন্য তাঁকে ১০০০ টাকা ফাইন দিতে হতো। তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না। অথচ সেই সময়ের ১০০০ টাকা আজকের দিনে কত টাকা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। 
সবসময় গান গাইতেন নিজের শর্তে।

গ্রামোফোন একবার গান গাইতে যাওয়ার জন্য তিনি পুরো ট্রেন চেয়ে বসেছিলেন আয়োজকদের কাছে। তাঁর সেই আবদার রক্ষা করা হয়েছিল। সেই ট্রেনে বাদ্যযন্ত্রী ছাড়াও বাবু্র্চি, বাবুর্চির সহকারী, ধোপা, নাপিত থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যক্তিগত সহকর্মী সঙ্গে নিয়েছিলেন।

গওহর জান ১৭ জানুয়ারি ১৯৩০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা গওহর জানের ভেতর একজন কবিই বাস করতেন। বিখ্যাত ঠুমরি ‘রসকে ভরে তোরে নয়ন’ গওহর জানের লেখা। সংসার জীবন নিজের মনের মতো করে সাজাতে পারেননি গওহর।

গওহর জান লিখেছেন, ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি উড়ে গেলো আর এলো না’। যেন নিজের জীবনের না পাওয়ার কথা, এই গানের কথায় জানান দিলেন। এই গান তিনি রেকর্ড করেন। যথারীতি গানে শেষে বললেন, ‘মাই নেম ইজ গওহর জান’। ঠিক যেমনটি তিনি তাঁর প্রথম গান রেকর্ড করে বলেছিলেন। শ্রোতারা গওহরের প্রায় প্রতিটি রেকর্ডের গান শেষে এই নামটি তাঁর কণ্ঠেই শুনতে পেতেন।

পরে অবশ্য অন্য অনেক শিল্পী তাঁকে অনুসরণ করে গান শেষে নিজের নাম বলতেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি

চলবে…

তথ্যসূত্র
“রাজত্ব খুইয়ে কলকাতায় আসা এক নবাবের গল্প”
Indian express.com 
August 27,2021.
‘গওহর জানের নিজের লেখা বাংলা গান, সুরও তাঁর’
দেবদত্ত গুপ্ত। বঙ্গদর্শন। জুন ২২, ২০১৯ 
“Gauhar Jaan of Calcutta-the first to record hindustani classical music on gramophone in India” by Indrajit Sen. www.getbengal.com.19 April,2021.
bengali.news18.com Jun26, 2018
www.tbsnews.net December 18,2021

/এমএম/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিমানবন্দর থেকে আ.লীগ নেতা হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার
বিমানবন্দর থেকে আ.লীগ নেতা হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার
রতন সিদ্দিকীর বাসায় হামলার ঘটনায় ওয়ার্কার্স পার্টির উদ্বেগ
রতন সিদ্দিকীর বাসায় হামলার ঘটনায় ওয়ার্কার্স পার্টির উদ্বেগ
শিক্ষক স্বপন কুমার লাঞ্ছনা: ‘চিত্ত যেথা ভয়ে পূর্ণ, নিম্ন যেথা শির!’
শিক্ষক স্বপন কুমার লাঞ্ছনা: ‘চিত্ত যেথা ভয়ে পূর্ণ, নিম্ন যেথা শির!’
আমদানি করা চাল বস্তায় বিক্রি করতে হবে
আমদানি করা চাল বস্তায় বিক্রি করতে হবে
এ বিভাগের সর্বশেষ
প্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব সাতপ্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!
অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ছয়অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন
রেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব পাঁচরেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক
‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব চার‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’
গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব তিনগান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক