ফ্লোরে ফ্লোরে লাইট-অ্যাকশন-ক্যামেরা, স্টুডিওতে ডাবিং, ল্যাবে সম্পাদনা, আঙিনায় শিল্পীদের হাসি-আড্ডা কিংবা নতুন ছবির পরিকল্পনা; এফডিসির এমন চিত্র যেন রূপকথার গল্পের মতো। যে গল্প কম-বেশি সবার জানা, কিন্তু নিজ চোখে দেখেছেন এমন মানুষের সংখ্যা ক্রম হ্রাসমান।
এফডিসিতে তারকাদের আনাগোনা কমতে কমতে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে এখন এখানে কাজে নয়, বরং কালেভদ্রে দায় সারতে মুহূর্তের জন্য আসেন তারা। মোটাদাগে বললে, সিনেমা কেন্দ্রিক সংগঠনগুলোর নির্বাচনের সময়ই তারকাদের ছায়া পড়ে সিনেমার আঁতুড়ঘরে। কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসের মতো দিনেও যে সেই খাঁ খাঁ শূন্যতা বিরাজমান থাকবে, তা হয়তো প্রত্যাশায় ছিল না অনেকেরই।
সোমবার (৩ এপ্রিল) জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস। বলা চলে, দেশের চলচ্চিত্রের একমাত্র উৎসবের দিন। এ উপলক্ষে এফডিসি কর্তৃপক্ষ নামমাত্র সাজসজ্জা সেরেছে। আয়োজন করেছে আনন্দ র্যালি, বেলুন-কবুতর ওড়ানো আর আলোচনা সভার। যেখানে অংশ নিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, এমন আয়োজনে সিনে তারকার সংখ্যা গুনলে হাতের আঙুলও শেষ হবে না! উদ্বোধনের মুহূর্তে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা গেছে কেবল নির্মাতা-অভিনেতা কাজী হায়াৎ, অভিনেত্রী রোজিনা ও সুজাতাকে। আলোচনা সভার পর এফডিসিতে দেখা গেছে চিত্রনায়ক ড্যানি সিডাক, বাপ্পী চৌধুরী ও সাইমন সাদিককে।
সংগঠন আর চেয়ার দখলের জন্যও যত শিল্পী-তারকার ভিড় দেখা যায় এফডিসিতে, তাদের ছায়াও চোখে পড়েনি এমন জাতীয় আয়োজনে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সিনেমার কল্যাণ এড়িয়ে এফডিসি কি তবে তাদের কাছে কেবলই সাংগঠনিক স্বার্থভূমিতে পরিণত হয়েছে?
২০১২ সাল থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিসব পালিত হচ্ছে। প্রতি বছরই দেখা যায়, এই দিনের আয়োজনে সিনেমার সুবাতাসের গল্প শোনান সংশ্লিষ্টরা। ব্যতিক্রম ঘটেনি এবারও। আলোচনা সভায় অতিথি হয়ে প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু কিংবা দায়িত্বশীল নির্মাতা ও পরিচালক সমিতির সভাপতি কাজী হায়াত ধরে রাখলেন সেই চিরচেনা বৈশিষ্ট্য।
তথ্যমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়ে কাজী হায়াৎ বলেছেন, “আমার জানা মতে, আন্তর্জাতিকভাবে চলচ্চিত্র দিবস নেই। আমাদের মাতৃভাষা দিবস যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমরা যদি জাতিসংঘের মাধ্যমে চেষ্টা করি, তাহলে এই জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস সারা বিশ্বে ‘ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ডে’ হিসেবে পালন করবে একদিন।’’
প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরুর বক্তব্য, ‘বলা হয় যে আমাদের রুপালি পর্দার একটা সোনালি অতীত ছিল। সেই অতীত মাঝে বিলীন হতে বসেছিল। তবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেই চলচ্চিত্রকে আবার পূর্ব দিগন্তে সূর্য দেখাচ্ছেন। আমাদের চলচ্চিত্রের সূর্য আবার উদিত হচ্ছে।’
চলচ্চিত্রের অভিভাবক তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছ থেকেও শোনা গেলো ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। তার ভাষ্য, ‘আশি-নব্বই দশকে চলচ্চিত্রের যে অবস্থা ছিল, নানা কারণে তা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্রকে সেই হারানো জায়গায় ফিরিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল গঠন করা হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল চালু করার জন্য, নতুন হল নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য। ইতোমধ্যে অনেক সিনেপ্লেক্স ও বন্ধ হয়ে যাওয়া হল চালু হয়েছে। কিছু বন্ধ হয়েছে যেমন সঠিক, কিন্তু যা বন্ধ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি চালু হয়েছে। এতে চলচ্চিত্র শিল্পের সুদিন ফিরে আসতে শুরু করেছে। চলচ্চিত্র শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।’
যদিও ইন্ডাস্ট্রির শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ দিনে চলচ্চিত্র অঙ্গনের সমস্যা, সংকট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে গঠনমূলক পর্যালোচনা হওয়া অধিক জরুরি। কেননা, সুবাতাসের গল্পগুলোর বাস্তব চিত্র খুঁজে পাওয়া দুষ্কর বটে।
যেমন গত বছরে অর্ধশতাধিক সিনেমা মুক্তি পেলেও সফল সিনেমার সংখ্যা মোটে দুটি। এগুলো হলো ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’। এর বাইরে আরও কয়েকটি ছবি মন্দের ভালো সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। বাকি সবগুলো নাম লেখায় ব্যর্থতার খাতায়। নতুন বছরে ইতোমধ্যে তিনটি মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এ পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কোনও সিনেমাই দেখেনি লাভের মুখ। অনবরত লোকসান গুনতে হচ্ছে দেখে হল মালিকরা তোড়জোড় চালাচ্ছেন ভারতীয় ছবি আমদানির জন্য। সেই প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে আবার পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা। এছাড়া সংগঠনগুলোর ভোট-চেয়ার দখলের লড়াই এবং শিল্পীদের ব্যক্তিগত মামলা-কেলেঙ্কারির ঘটনা তো রোজনামচার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এসবের মধ্যেও প্রতি বছর চলচ্চিত্র দিবসে ‘চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়ায়’, হয়তো আগামীতেও দাঁড়াবে; বাস্তবে না হোক কথার ফুলঝুরিতে!









