X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০
বুসান ডায়েরি-২

দিনশেষে বাংলাদেশি টাকার হিসাব করলে স্বস্তি পাই

জনি হক, বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে
জনি হক, বুসান (দক্ষিণ কোরিয়া) থেকে
০৯ অক্টোবর ২০২৩, ১২:৩৬আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৩, ১৩:১৩

বুসানে দ্বিতীয় দিনের সকাল থেকে আকাশে বৃষ্টিকে সাজিয়ে রেখেছে মেঘেরা। যেকোনও মুহূর্তে ঝুম করে নামতে পারে। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। আবহাওয়া নিয়ে অত ভাবার ফুরসত নেই। ব্যাজ নেওয়াসহ বিভিন্ন কাজে তাড়া আছে। হিয়ুন্দে থেকে সেন্টাম সিটি যেতে হবে। সেখানেই বুসান উৎসবের প্রাণকেন্দ্র।

বাসস্ট্যান্ডে বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের সাদা ও নীল লম্বালম্বি ব্যানার। সেগুলো চোখে পড়তেই দ্রুত যাওয়ার অস্থিরতা যেন আমাদের তিন জনের মধ্যে বেড়ে গেলো। শুরুতে বাসে চড়ে যাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ চালানো হলো। কিন্তু ভাষাগত জটিলতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ। মেট্রোস্টেশনে এক কোরিয়ান তরুণী সহায়তা করতে এগিয়ে এলেন। আমাদের গন্তব্য জেনে গুগল ট্রান্সলেটের মাধ্যমে কী কী যেন বললেন। তার ভাষার আগাগোড়া কিছুই বুঝতে না পারায় সেদিকে পা বাড়ানো সুবিধার মনে হলো না। পরে অন্য মেট্রোস্টেশনে গিয়ে নিজেরাই দিকনির্দেশনা খুঁজে বের করলাম। হিয়ুন্দে থেকে দুটি মেট্রোস্টেশন পেরোলোই সেন্টাম সিটি। মেশিন থেকে টিকিট কিনে নিলাম, তিনটি টিকিটের মূল্য ৪৬৫০ ওন। গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগলো ১০-১২ মিনিট। বৃষ্টিস্নাত বুসান

মেট্রোস্টেশন থেকে বেরিয়ে ১০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে বুসান ফিল্ম সেন্টার। পথচারীরা ট্রাফিক সিগন্যালের মতো সবুজ সংকেত পেলেই কেবল রাস্তা পার হন। নয়তো সড়কে গাড়ি না দেখলেও দাঁড়িয়ে থাকেন সবাই। কী সুন্দর! যেকোনও নিয়ম মেনে চলার দৃশ্য এমনই লাগে দেখতে। বুসান পরিপাটী শহর। এখানকার সবকিছুই সাজানো-গোছানো। তিন দিকে পাহাড়ের হাতছানি। তার নিচে ইট-পাথরের নাগরিক কোলাহল।

উৎসব আয়োজকেরা ইমেইলে আগেই জানিয়ে রেখেছিল, বুসান সিনেমা সেন্টারের বিআইএফএফ হিলে প্রেস ডেস্ক থেকে ব্যাজ সংগ্রহ করতে হবে। ব্যাজের সঙ্গে মিললো ব্যাগ, প্রেস গাইড ও অফিসিয়াল সিলেকশনের স্মরণিকা। কোনও ভিড়-ভাট্টা নেই। এক নিমিষেই সব পাওয়া যাচ্ছে। ভবনটির দোতলা ও তৃতীয় তলায় সংবাদকর্মীদের কাজ করার জন্য দুটি পৃথক জায়গা বরাদ্দ। তবে বেশিরভাগ চেয়ার ফাঁকা। দুই-তিন জনকে কেবল চোখে পড়লো মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। কান চলচ্চিত্র উৎসবে এ দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। কানে প্রেস রুমে জায়গা শূন্য থাকার অর্থ উৎসবের শেষ দিন এসে গেছে! যদিও কান আর বুসানকে মিলিয়ে ফেলা মোটেও ঠিক হবে না। কান বৈশ্বিক আসর, বুসান এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। তাছাড়া কান উৎসবের বয়স ৭৬ বছর। আর বুসান ২৮তম আসর পার করছে।

কোরিয়ার পথে পথে উৎসবের সাদা ও নীল লম্বালম্বি ব্যানার দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। পেট চো-চো করছে। চারদিকে খাবারেরও অভাব নেই। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত খাবার মেলা দায়! সেন্টাম সিটির দিকে বাঙালি খাবার স্বপ্নেও দেখা যায় না! ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে চিকেন পপকর্ন আর কোমল পানীয় কেনা হলো। বিল এলো ৮ হাজার ৫০০ ওন। এরমধ্যে নামলো বৃষ্টি। সকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেয়েই বোধহয় বেশিরভাগ মানুষ ছাতা নিয়ে বেরিয়েছে। সবার হাতে হাতে ছাতা। বৃষ্টি বড় বেরসিক। একটু পরপর থেমে আবারও গুড়িগুড়ি আকারে শুরু হয়। মোটামুটি দিনের বেশিরভাগ সময় বন্দি থাকতে হলো মূল ভবনে।

তৃতীয় তলার প্রেস রুমের সামনের সারি থেকে বিআইএফএফ থিয়েটার দেখা যায়। এখানেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে। সমাপনীও হবে। বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান এই ভেন্যুতেই থাকে। বৃষ্টিতে আটকে এশিয়া কন্টেন্টস অ্যাওয়ার্ডস অ্যান্ড গ্লোবাল ওটিটি অ্যাওয়ার্ডস দেখছি। বলিউড অভিনেত্রী কারিশমা তান্না ‘স্কুপ’ সিরিজের জন্য পুরস্কার পেলেন। কালো শাড়িতে চমৎকার লেগেছে তাকে। তিন তলার প্রেস রুমে টিভিতে এসব অনুষ্ঠান দেখা যায়। দেয়ালে ওয়াইফাই আইডি ও পাসওয়ার্ড লাগিয়ে রাখা হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধাও আছে। এছাড়া চার্জ দেওয়ার প্রচুর অপশন।

উৎসব সেন্টার সন্ধ্যা গড়ানোর পর বৃষ্টি থামে। বুসান সিনেমা সেন্টারের উল্টো দিকে স্টারবাকস থেকে দুই রকম কুকিজ আর কোমল পানীয় নিলাম। দাম পড়লো ১৩ হাজার ৬০০ ওন। এরপরের সময়টা কাটলো মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও নুসরাত ইমরোজ তিশার ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ দেখে। এর প্রদর্শনী শুরুর আগে ফারুকী-তিশার সঙ্গে তাদের মেয়ে ইলহাম মঞ্চে এলো। এবারের উৎসবের সবচেয়ে ক্ষুদ্র আমন্ত্রিত অতিথি সে। সিনেমাথিক থিয়েটারে তখন এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, বাংলাদেশি ছিলেন নিউ কারেন্টস বিভাগে নির্বাচিত ‘বলী’র অভিনেতা নাসির উদ্দিন খানসহ কেবল তিন-চার জন। বাকিরা সবাই হয় কোরিয়ান, নয়তো চীনা-জাপানি। বাংলা ভাষা তাদের জানা আছে বলে মনে হয় না। অথচ ১ ঘণ্টা ২২ মিনিট চুপচাপ বসে তারা সবাই ছবিটি উপভোগ করেছেন। এমন আগ্রহ দেখে ভালো লাগলো, নিজের দেশের ছবি বলে কথা! কান উৎসবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে এমন আবহ পেয়েছিলাম। দেশের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী দেখার অভিজ্ঞতা অন্যরকমই হয়।

রাতে মেট্রোরেলেই চড়ে হোটেলে ফিরে আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো খাবার নিয়ে। কী খাওয়া যায়? এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব কঠিন বুসান শহরে। কারণ কোনটা সত্যিকার অর্থেই হালাল, সেটা বোঝা ও জানা দুরূহ। হোটেল থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে পৌঁছে একটি রেস্তোরাঁ দেখে ঢুকে পড়লাম। প্রচুর ভোজনরসিক। বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। খানাপিনা আর কথার শব্দ ঘুরপাক খাচ্ছে চারদিকে। টেবিলে রাখা ছোট মনিটরে অর্ডার দিতে হয়। চিকেন আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিলাম। খাবার শেষে তিন জনের বিল গুনতে হলো ৩১ হাজার ৮০০ ওন। হিসাব করে দেখলাম দ্বিতীয় দিন গেলো ৬৩ হাজার ২০০ ওন। বাংলাদেশি মুদ্রায় রূপান্তর করলে অঙ্কটা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫০০ টাকারও কম। হিসাবের শুরুতে দুশ্চিন্তা ভর করলেও শেষে গিয়ে স্বস্তি পাওয়া যায়। দিনভর কোরিয়ান নোট যতবারই খরচ করি, চোখমুখ কালো হয়ে যায় মেঘের মতো! তবে দিনশেষে বাংলাদেশি টাকার হিসাব করলে স্বস্তি ফিরে পাই, অনেকটা মেঘ কেটে রোদ ওঠার মতো! ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’র দর্শক

/এমএম/
সম্পর্কিত
ইউরোপীয় হাওয়ায় শুরু হলো টোকিও উৎসব, ফোকাসে বেগম রোকেয়া
ইউরোপীয় হাওয়ায় শুরু হলো টোকিও উৎসব, ফোকাসে বেগম রোকেয়া
শেষবেলায় সাগরপাড়ে, সিউলে চাটগাঁইয়া খাবারের পসরা
বুসান ডায়েরি-৬শেষবেলায় সাগরপাড়ে, সিউলে চাটগাঁইয়া খাবারের পসরা
গিনেস রেকর্ডধারী ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং ‘এশিয়ার কান’
বুসান ডায়েরি-৫গিনেস রেকর্ডধারী ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং ‘এশিয়ার কান’
লালগালিচা থেকে পুরস্কার জয়, বুসানে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি
লালগালিচা থেকে পুরস্কার জয়, বুসানে বাংলাদেশের জয়ধ্বনি
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
ফের ‘লাকি পার্টনার’র সঙ্গে ফারিণ!
ফের ‘লাকি পার্টনার’র সঙ্গে ফারিণ!
গানে ফারিণ, সঙ্গে তাহসান, পেছনে ইমরান
গানে ফারিণ, সঙ্গে তাহসান, পেছনে ইমরান
দেড় যুগের গান-গল্প শোনাবেন শাওন
দেড় যুগের গান-গল্প শোনাবেন শাওন
বক্স অফিসে নারীর দাপট
বক্স অফিসে নারীর দাপট
ইন্ডিয়ান আইডল ১৪: পেলেন ২৫ লাখ রুপি ও গাড়ি, জানালেন বিশেষ ইচ্ছে
ইন্ডিয়ান আইডল ১৪: পেলেন ২৫ লাখ রুপি ও গাড়ি, জানালেন বিশেষ ইচ্ছে