চলতি বছর এফডিসি ৭০ বছরে পা দিয়েছে। এটি এখন সাত দশক বয়সী এক জরাজীর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর শরীর জুড়ে বার্ধক্যের বলিরেখা। চলৎশক্তি হারিয়ে বলতে গেলে অচল চলচ্চিত্র তৈরির আঁতুরঘরটি। টোটকা, জড়িবুটি, কবিরাজি দাওয়াই দিয়েও একে কর্মচঞ্চল করে তোলা যাচ্ছে না। একসময় যে এফডিসি তারকাদের পদভারে গমগম করত, শুটিংফ্লোরে রোজই লেগে থাকত উৎসবের আমেজ, সেখানে এখন কবরের নিস্তব্ধতা, শ্মশানের নীরবতা।
নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে। এফডিসি ধসে পড়লেও অন্যপ্রান্তে গড়ে উঠছে চলচ্চিত্রের নতুন মাতৃসদন। তেজগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা ছেড়ে সিনেমা এখন গুলশানের আবাসিক এলাকা—নিকেতনমুখী। একসময় বিজ্ঞাপন শিল্পের অফিসপাড়া বলে পরিচিত নিকেতন এখন সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপনসহ সমস্ত ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার প্রাণকেন্দ্র।
একসময় এফডিসিতে উৎপাদিত সিনেমার বিপণন হত কাকরাইল থেকে। আদিতে গুলিস্তান, বিজয়নগরও সিনেমাপাড়া বলে পরিচিত ছিল। শেষের দিকে কাকরাইলের ২৫০-৩০০ প্রডাকশন হাউজের অফিসে সীমসাবদ্ধ হয়ে পড়ে সিনেমার বিপণনব্যবস্থা। সেই কাকরাইল ছবিপড়ায় এখন ভয়াবহ শূন্যতা। ১০/১২টি অফিসে এসে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ফিল্মপাড়া। গত কয়েক বছরে শতাধিক প্রযোজনা সংস্থার অফিসে তালা পড়েছে।
নতুন করে যারা প্রযোজনায় এসেছেন, তারা অফিস খুলেছেন নিকেতনে। শোবিজের সিংহভাগ অফিস এখন রাজধানীর এই এলাকায়। লোকে বলছে, সিনেমা এখন নিকেতনের দখলে। নির্মাতা হিসেবে এখানে যাদের বেড়ে ওঠা, ইদানীং তাদের হাতেই সিনেমার রাশ। তাদের নির্মিত ছবির ধারাবাহিক সাফল্য তাদেরকে সিনেমার ধারক-বাহকে পরিণত করছে। প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পীদের পদচারণায় যেন এফডিসির মতোই জেগে উঠছে নিকেতন।
কীভাবে এফডিসি তথা কাকরাইলের ধসের বিপরীতে শক্তি সঞ্চয় করল নিকেতন, হয়ে উঠল সিনেমার নতুন তীর্থস্থান, চলুন সেই রহস্যভেদ করি..।
গল্পটা শুরু করতে হয় ‘মনপুরা’ থেকে। নাটকের লোক আগেও সিনেমা বানিয়েছে। শূন্য দশকে হুমায়ুন আহমেদ নিয়মিত ছবি বানাতেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর 'ব্যাচেলর', সালাহউদ্দিন লাভলুর 'মোল্লা বাড়ির বউ' আর এস এ হক অলিকের 'হৃদয়ের কথা' ছবির দর্শকসাড়ার কথা কারও অজানা নয়। নাটকের লোকের বানানো ছবি যে ব্লকবাস্টার হতে পারে, এমনটা কেউ ভাবেনি আগে। শাকিব খানের ছবি ছাড়া সব ছবি যখন বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ছে, তখন ২০০৯ সালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবির তকমা পায় ‘মনপুরা’।
কোথাকার কোন চঞ্চল চৌধুরীর ছবি ৩৫ লাখ টাকা দামের নায়ক শাকিব খানের ছবিকেও পেছনে ফেলে দেয়। এই ঘটনার প্রভাব সিনোমায় ধীরে-ধীরে পড়তে শুরু করে। একজন দুজন করে নাটকের নির্মাতা সিনেমায় পা ফেলতে থাকেন।
‘মনপুরা’র বছর ২০০৯ সালেই ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘গঙ্গাযাত্রা’, ‘রূপান্তর’, ‘বৃত্তের বাইরে’ ইত্যাদি ছবি মুক্তি পায়। ২০১০ সালে মুক্তি পায় ‘জাগো’, ‘অপেক্ষা’, ‘ডুবসাঁতার’ ইত্যাদি। ‘গেরিলা’, ‘প্রজাপতি’ মুক্তি পায় ২০১১ সালে। ২০১২ সালে মুক্তি পায় ‘কমন জেন্ডর’, ‘চোরাবালি’, ‘উত্তরের সুর’, ‘ফিরে এসো বেহুলা’ ইত্যাদি। ২০১৩ সালে মুক্তি পায় ‘টেলিভিশন’, ‘কাজলের দিনরাত্রি’, ‘মৃত্তিকা মায়া’, ‘অন্তর্ধান’ ইত্যাদি। ‘পিতা’, ‘বৃহন্নলা’, ‘অনুক্রোশ’, ‘হরিজন’ মুক্তি পায় ২০১৪ সালে।
২০১৫ সালে মুক্তি পায় ‘জালালের গল্প’, ‘ঘাসফুল’, ‘ইউটার্ন’, ‘নয়ছয়’, ‘নদীজন’, ‘প্রার্থনা’, ‘হরিযুপিয়া’, ‘জিরো ডিগ্রি’, ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ ইত্যাদি।
২০১৩ সালে ডিজিটাল প্রদর্শনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ছোটপর্দার নির্মাতাদের ছবি বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। ফিল্ম বাতিল হয়ে যাওয়ায় ছবির নির্মাণব্যয় কমে আসে। যারা খরচের ভয়ে সিনেমা নির্মাণ করার সাহস করতেন না, তারাও তখন হাসতে-হাসতে এফডিসিতে ফ্লোর ভাড়া নিতে চলে আসেন। নতুন-নতুন মুখ দেখা যায় তেজগাঁওতে।
এফডিসিতে চলচ্চিত্র সংগঠনের অফিসে আড্ডায় মত্ত শিল্পী-পরিচালকদের চোখে বিস্ময়- ‘কোথা হতে আসছে এরা?’ ততদিনে তাদের হাতে আড্ডা দেওয়ার মতো সময় চলে এসেছে। আগে তো প্রতিদিন শুটিং-ডাবিংয়ে তাদের ফুরসত মিলত না বিজ্ঞাপনের শুটিংইউনিটের দিকে চোখ তুলে তাকানোর। এখন যখন তাদের হাতে কাজ কমে আসছে, তারাও ভাবছেন- ‘ঘটনাটা কী ঘটছে?’
২০০৮ সালে চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যুর পর থেকেই সিনেমা শিল্প ভারসাম্যহীন। ১০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক থেকে কয়েক লাফে ৩৫ লাখ টাকায় পৌছে যান শাকিব খান। বছরে ১৫-১৬টি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ঈদে তার কমপক্ষে ৪টি ছবি মুক্তি পায়। ঈদে ৩০০ প্রেক্ষাগৃহে তার নতুন ছবি মুক্তি পায়। তার পুরনো ছবি চলে আরো ৩০০ প্রেক্ষাগৃহে। তার ছবি উচ্চমূল্যে রেন্টাল হয়। তার সামনে কোনো নায়কই দাঁড়াতে পারেন না। শুধু একবার, স্রেফ একবার তার ঘাঁড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন চঞ্চল চৌধুরী। নয়তো আর কেউ ধারে-কাছেই ঘেষতে পারেননি। এই অবস্থাটা বদলে যেতে শুরু করে ১০১৩ সাল থেকে। ওই বছর শাকিব অভিনীত মাত্র ১০টি ছবি মুক্তি পায়।
শাকিব-অপু-মিশা—এই তিন তারকা ঢালিউডের রূপালি পর্দাকে একঘেয়ে করে তোলেন। পর্দায় শাকিবের একচেটিয়া রাজত্ব দর্শককে একঘেয়েমিতে ভোগাতে শুরু করে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসায়। ০৬-০৭ সালের দিকে শাকিবের ছবি যেমন চুটিয়ে ব্যবসা করত, ১১-১২ সালের দিকে এসে তেমন ব্যবসা আর করতে পারে না।
ফলে তার ছবির প্রযোজকরা হতাশ হয়ে পড়েন। মান্না চলে যাওয়ার পর থেকেই একনায়ককেন্দ্রিক ইন্ডাস্ট্রিতে হতাশা বাড়ছিল। মান্নার শূন্যতাটা কিছুতেই পূরণ হচ্ছিল না। এক নায়কের অঙ্গুলিহেলনে প্রযোজকরা আর নাচতে চাইছিলেন না। ২০১৩ সালের দিকে এসে তারা পাততাড়ি গোটাতে শুরু করলেন।
সূচনা হল কাকরাইলপাড়া পতনের।
শাকিব খানকে নিয়ে যে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছবি বানাতেন তারা একে একে বিদায় নিতে থাকেন। জননী কথাচিত্র, সন্ধানী কথাচিত্র, আশা প্রডাকশন্স, তুষার কথাচিত্র, তিতাস কথাচিত্র, বন্ধন বাণীচিত্র, লিবার্টি কথাচিত্র, দিগন্ত চলচ্চিত্র, ঋদ্ধি টকিজ, কিষাণ চলচ্চিত্র, মডার্ন ফিল্মস, মেরিনা মুভিজ, তন্ময় কথাচিত্র, অপূর্ব চলচ্চিত্র—এই সমস্ত প্রতিষ্ঠিত ব্যানার নিজেদের গুটিয়ে নেয় চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে।
২০১৪ সালে শাকিব অভিনীত ছবি মুক্তি পায় ১০টি। ২০১৫ সালে মুক্তি পায় ৫টি। ২০১৬ সালে মুক্তি পায় ৮টি। ২০১৭ সালে মুক্তি পায় ৫টি। ২০১৮ সালে মুক্তি পায় ৮টি। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় মাত্র ৩টি ছবি। ওই বছর দুই ঈদের বাইরে তার কোনো ছবিই মুক্তি পায় না। এখান থেকেই দুই ঈদের মধ্যে আটকে যান। এখনও ঈদের বাইরে তার কোনো ছবি মুক্তি পায় না। আর পেলেও দু/তিন বছরে হঠাৎ একটা। এফডিসিকেন্দ্রিক প্রযোজন সংস্থাগুলো চলে গেলে এভাবেই শাকিবের ক্যারিয়ারের ওপর বিরাট ধাক্কা আসে। কোভিডের সময় তার ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। তখন ৯ মাসের জন্য তিনি আমেরিকা চলে যান।
শাকিবকে নিয়ে ছবি তৈরি করলে ছবির ব্যয় বেড়ে যায়। এই নায়ক যখন ইন্ডাস্ট্রির শাসনভার হাতে নেন, তখন সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৮০০-এর ওপরে। ফিল্মের যুগ শেষে যখন ডিজিটালের যুগ আসে, তখন সিনেমা হল নেমে এসেছে ৬০০-তে। ব্যবসা সংকুচিত হওয়ায় প্রযোজকরা শাকিবের কাছ থেকে দূরে সরে আসেন।
সনি কথাচিত্রের মতো দুয়েকটি পুরনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মারুফ, বাপ্পি, সাইমন, ইমন, নিরব, শুভকে নিয়ে একাধিক ছবি নির্মাণ করে। কাঙিক্ষত সাফল্য ধরা না দেয়ায় যে কতগুলো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ধুঁকছিল, তারাও ফিল্ম বিজনেস থেকে কেটে পড়ে।
আর তখন মনোপলি ব্যবসা কায়েম করে জাজ মাল্টিমিডিয়া। একঝাঁক নতুন শিল্পী আর নতুন নির্মাতা নিয়ে সিনেমায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ব্যানারটি। কাকরাইল থেকে ফিল্মওয়ালাদের আনাগোনা সরে যায় মগবাজারে। যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এফডিসির সংগঠনগুলোর তোপের মুখে পড়ে। আর এই যৌথ প্রযোজনার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনই এফডিসির শক্তিমত্তার শেষ প্রদর্শন।
২০১৬ সালে ‘আয়নাবাজি’ সুপারহিট হলে এফডিসি আরও শক্তি হারায়। কেননা অমিতাভ রেজার স্কুলিং ছিল না এফডিসির, তার ছবির পুঁজিদাতাদের সঙ্গেও ছিল না কাকরাইলের সম্পৃক্ততা। ‘মনপুরা’র চঞ্চল চৌধুরী আবারও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের ঢল নামান। তিনি ফিরিয়ে আনেন হলবিমুখ পুরনো দর্শকদের।
এই ছবি থেকে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। পরের বছর ছোটপর্দার আরেক নির্মাতা দীপংকর দীপন বক্স অফিসে তোলপাড় ফেলে দেন 'ঢাকা অ্যাটাক' বানিয়ে। এবার আর অফট্র্যাক গল্প নয়, পুরোদস্তুর এফডিসি ঘরানার অ্যাকশন ছবি। অথচ তার নির্মাতা মালেক আফসারী কিংবা বদিউল আলম খোকন নন, মুম্বাই থেকে তামিল নেয়া দীপংকর দীপন।
এফডিসির ভাঙন আরো তীব্র হয় ২০১৮ সালে অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’ মুক্তি পাওয়ার পর। যথারীতি বক্স অফিস বিজয়ের নায়ক চঞ্চল চৌধুরী। তার সঙ্গে যোগ হন ছোটপর্দার অদ্বিতীয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। শাকিব খানের সঙ্গে আগেই তার হিট ছবি ছিল, এবার একক হিট দিয়ে নিজের আসন যেমন পাকা করেন, তেমনই ভিন্নধর্মী ছবি করিয়েদেরও প্রেরণার কারণ হন এই শিল্পী। ওই একই বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সনে 'মনপুরা'র নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম ফিরে আসেন ‘স্বপ্নজাল’ নিয়ে।
আগের মতো সাফল্য না পেলেও তার ফিরে আসাটা ইঙ্গিতবহ। ‘মাটির প্রজার দেশে’ আর ‘কমলা রকেট’-এর মতো ছবির মুক্তি বলছিল, সামনেই নতুন হাওয়া। ২০১৮ সালেই আত্মপ্রকাশ করেন সেই তরুণ নির্মাতাটি, যার হাত ধরে সিনেমার পালাবদলের সূচনা। রায়হান রাফীর ‘পোড়া মন টু’ মুক্তির পর দর্শক সাড়া মিললেও তখন বোঝা যায়নি যে এই পরিচালকের ব্রেইন বদলে দিতে চলেছে ঢালিউডের খোলনলচে।
২০১৯ সালে নজর কাড়ে নতুন নির্মাতার মিছিল। ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নিয়ে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, ‘সাপলুডু’ নিয়ে গোলাম সোহরাব দোদুল, ’ন ডরাই দিয়ে তানিম রহমান অংশু আর ‘কাঠবিড়ালী’ নিয়ে নিয়ামুল মুক্তা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ওই বছর ‘ইতি তোমারই ঢাকা’ ছবিতে একঝাঁক নির্মাতার সম্ভাবনার ঝলক দেখা যায়, যারা আজকের দিনে সিনেমার আকার-আকৃতি পাল্টে দিতে নিরন্তর ভূমিকা রেখে চলেছেন। ওই সময় এই তরুণ তুর্কীদের সঙ্গে তৌকীর আহমেদ আর মোস্তফা কামাল রাজের মতো প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদেরকেও সমান সরব দেখা যায়।
এরপর আসে কোভিড। এই সময় আমাদের চলচ্চিত্র চিরতরে বদলে যায়। উত্থান ঘটে ওভার দ্য টপ প্ল্যাটফর্মের। চরকি আর হৈচৈ বাংলাদেশ আসার আগেই ‘জানোয়ার’ বানিয়ে নতুন দিনের নিশান উড়িয়ে দেন রায়হান রাফী। ওটিটি জনপ্রিয় হতে থাকে আর বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে ভিকি জাহেদ, আশফাক নিপুণ, মিজানুর রহমান আরিয়ানের মতো নির্মাতাদের প্রতিভার। তারা ওয়েব সিরিজ আর ওয়েব ফিল্মের মতো বিদেশি কনসেপ্টকে দেশি দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। বলাই বাহুল্য, এই সমস্ত কাজের উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণ ঘটে নতুন ছবিপাড়া নিকেতন থেকে।
কোভিডের পর ২০২২ সালে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ দিয়ে সূত্রপাত সিনেমার যুগবদলের। রায়হান রাফী ও মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণকৌশলে কাত ঢালিউড। মাল্টিপ্লেক্সে আঘাত করে বাংলা ছবির নতুন ঢেউ। পরের বছর রায়হান রাফীর 'সুড়ঙ্গ' আর হিমেল আশরাফের ‘প্রিয়তমা’ সেই ঢেউকে পরিণত করে সুনামিতে। ইংরেজি সিনেমাকে হারিয়ে বাংলা সিনেমার জয়ধ্বনি ওঠে মাল্টিপ্লেক্সে। এরপর এই গল্পে যুক্ত হয় ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘উৎসব’, ‘তাণ্ডব’, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মতো নতুন-নতুন অধ্যায়। তিন বছর একটানা রাফী-বন্দনার পর ২০২৫ সালে তার পাশে এসে বসেন তানিম নূর।
নির্মাতার মতো নির্মাতা-প্রতিষ্ঠানেও দেথা যাচ্ছে নতুন নাম। ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ আলফা-আইয়ের। সংস্থাটির অধিকর্তা শাহরিয়ার শাকিল এখন দাপুটে প্রযোজক। ‘প্রিয়তমা’র ভার্সেটাইল মিডিয়ার গায়ের গন্ধ অবশ্য একদম তাজা নয়। আরশাদ আদনান একাধিক ছবিতে ব্যর্থতার পর ‘প্রিয়তমা’ ব্লকবাস্টার করিয়ে বনে গেছেন নতুন চলচ্চিত্র-নেতা।
‘বরবাদ’-এর রিয়েল এনার্জি নিয়মিত ছবি করছে। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দিয়ে সূচনা বুড়িগঙ্গা টকিজের। ‘রকস্টার’-এর সান মোশন পিকচার্স, ‘দরদ’-এর অ্যাকশন কাট এন্টারটেইনমেন্ট—এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান একটি/দুটি ছবি প্রযোজনা করে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে সিনেমার আঙিনায়।
চলচ্চিত্রে এখন প্রবাহিত হচ্ছে নতুন পুঁজি। এই পুঁজির রং নিয়ে কথা উঠতেই পারে। কিন্তু সিনেমা শিল্পের বিকাশে নতুন পুঁজির বিকল্প নেই। পুরনো পুঁজি আর এখানে খাটছে না। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের মতো গুটিকয় প্রতিষ্ঠান এখনও কর্মক্ষম। কিন্তু বাজারের জন্য ছবি না বানিয়ে বছর-বছর নির্মাতা পয়দা করাই যেন এই সংস্থার উদ্দেশ্য। একইভাবে জাজ মাল্টিমিডিয়াও বিতর্কে জড়িয়ে আগের মতো সবল নেই। ফলে সিনেমা শিল্পের চাকা সচল রাখতে ভরসা করতে হচ্ছে নতুন জ্বালানির ওপর। আর এই ইন্ধন সরবরাহ করছে নিকেতনের আনকোরা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
এফডিসি যখন নির্বাচন আর পিকনিক নিয়ে বছরভর ব্যস্ত, তখন নিকেতনে জেগে উঠছে সিনেমার নতুন ভূমি। নতুন চরের মতো সেই ভূমিতে জেগে উঠছে নতুন স্বপ্ন। আবাসিক এলাকা হলেও নিকেতনের ফ্ল্যাটে ফ্লাটে নির্মাতা, প্রযোজকদের অফিস, এডিটিং প্যানেল, সাউন্ড স্টুডিওতে নতুন নতুন সৃষ্টির আমেজ।
এফডিসির সভা, সমিতি, কোন্দল আর কেওয়াজের বিপরীতে নিকেতন ধেয়ে আসছে গুণগত পরিবর্তনের পতাকা হাতে। বিদেশি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করছে নিকেতন। বাইরে থেকে পুঁজি আনছে দেশে। উল্টোপিঠে এফডিসি নিজের ঐতিহ্য, অতীত আর গৌরব নিয়ে ক্রমাগত ডুবছে...।
লেখক: সাংবাদিক, সমালোচক





