বর্ষা মানেই শুধু জলাবদ্ধতা, যানজট কিংবা ভোগান্তি—এই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বর্ষার সৌন্দর্য, ছন্দ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উদযাপন করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে নৃত্যানুষ্ঠান ‘ঘনঘটা ২’। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগও রাখা হয় এ আয়োজনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগিতায় শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমি।
আয়োজকরা জানান, প্রায় চার মাস আগে থেকেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির পর আয়োজনের সঙ্গে মানবিক উদ্যোগ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানস্থলে জাগো ফাউন্ডেশনের দুটি বুথের মাধ্যমে বন্যার্তদের জন্য অনুদান সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সদস্যরাও ব্যক্তিগতভাবে অনুদান দেন।
আয়োজক অর্থি আহমেদ বলেন, ‘শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি আমাদের একটি দায়িত্ব রয়েছে। তাই বর্ষা উদযাপনের পাশাপাশি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ যেন শুধু বর্ষা উদযাপনই না করে, একইসঙ্গে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও সুযোগ পায়—আমরা এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চেয়েছি।’
তহবিলের পরিমাণ হয়তো খুব বেশি হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংকটের সময়ে শিল্পীদের নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত কতটা সহায়তা করতে পারব, তা জানি না। কিন্তু উদাসীন থাকা কোনো বিকল্প হতে পারে না।’
৯০ মিনিটের এই নৃত্যানুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত মোট ১৬টি নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এতে তিন থেকে ৭০ বছর বয়সী ৩০০-এর বেশি শিল্পী অংশ নেন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যেমন ছিল শিশু ও প্রথমবারের মতো মঞ্চে ওঠা নৃত্যশিল্পী, তেমনি ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক, গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। গত বছর প্রথম আয়োজনের তুলনায় এবার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। প্রথম ‘ঘনঘটা’য় অংশ নিয়েছিলেন ১১০ জন শিল্পী।
অর্থি আহমেদ বলেন, ‘প্রথম ঘনঘটা অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই হয়েছিল। এবার দর্শক ও অংশগ্রহণকারীরাই আবারও আয়োজনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। সেটিই আমাদের আরও বড় আয়োজন করতে উৎসাহ দিয়েছে।’
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এক নৃত্যশিল্পী বলেন, ‘নাচ শুধু একটি শিল্প নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ আয়োজনের অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে।’
আরেক অংশগ্রহণকারী বলেন, ‘অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি খুবই অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন।’
দর্শকদের মধ্যেও ছিল উৎসবের আমেজ। একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। নাচের সমন্বয়, রঙের ব্যবহার, চারুকলার পরিবেশ—সব মিলিয়ে দারুণ একটি আয়োজন।’
আরেকজন বলেন, ‘ছোট থেকে বড় সবাই সমানভাবে উৎসবটি উপভোগ করছে। দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে এ ধরনের আয়োজন আমাদের জন্য অক্সিজেনের মতো।’
আয়োজকদের ভাষ্য, ‘ঘনঘটা ২’ শুধু একটি নৃত্যানুষ্ঠান নয়; এটি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন, শিল্পচর্চা ও মানবিক দায়িত্ববোধকে একসঙ্গে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। বর্ষার ছন্দ, নাচের উচ্ছ্বাস এবং বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান—সব মিলিয়ে চারুকলার বকুলতলা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।









