মুখোমুখি: গাজী রাকায়েত

‘একটি বৈষম্যের গল্প বলতে চেয়েছি’

রুদ্র হক
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৫আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:২২

গুণী অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক গাজী রাকায়েত পরিচালিত নতুন চলচ্চিত্র ‘মানুষটিকে দেখ’। তাঁর প্রতিটি নির্মাণই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পুরস্কার ও সম্মাননায় সিক্ত হয়েছে। ২০১৩ সালে ‘মৃত্তিকা মায়া’ এবং ২০২০ সালে ‘গোর’—দুটি চলচ্চিত্রই যার স্বাক্ষর বহন করে। এবার তিনি নির্মাণ করেছেন ‘মানুষটিকে দেখ’। ২০২৫ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রটি সম্প্রতি সেন্সর সার্টিফিকেট পেয়েছে। পহেলা বৈশাখে মুক্তির কথা থাকলেও এটি মুক্তি পাচ্ছে মহান মে দিবসে। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন চলচ্চিত্রটি নির্মাণের আদ্যোপান্ত।

দীর্ঘদিন পর আপনার নির্মিত নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে। এটি সম্পর্কে জানতে চাই—

‘মানুষটিকে দেখ’ আমার তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। আমার আগের দুটি সিনেমা ‘মৃত্তিকা মায়া’ ও ‘গোর (The Grave)’ অনেকগুলো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল এবং জনপ্রিয়ও হয়েছিল। আশা করি, বাংলাদেশের দর্শকরা এই সিনেমাটিও পছন্দ করবেন। এই সিনেমার নির্মাণে একদল অসাধারণ অভিনয়শিল্পীর সাথে ক্যামেরার পেছনে কাজ করেছেন দেশের নামকরা সব কলাকুশলী।

এই সিনেমায় শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন উত্তম গুহ। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন শেখ রাজিবুল ইসলাম। আবহসংগীত করেছেন সৈয়দ সাবাব আলী আরজু। কস্টিউম ডিজাইনার ছিলেন সাকি তারা। আর সিনেমাটি সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন প্রিন্স সজল এবং কালার গ্রেডিং করেছেন সৌরভ দাস।

চলচ্চিত্রটি কী বিষয়ের ওপর নির্মিত?

সেরিব্রাল পালসি এমন একটি রোগ যা জন্মের পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত চিকিৎসা করলে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব; এরপর এটি আর পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য থাকে না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সারাজীবন এই সীমাবদ্ধতা বয়ে বেড়াতে হয়। তেমন কিছু মানুষকে ঘিরেই এ গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। এই রোগটি সম্পর্কে বিদ্যমান কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ মানুষের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছে ‘মানুষটিকে দেখ’। এর ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে ‘See the Person’।

একটু গল্পের ঢঙে যদি বলতেন—

পর্দার প্রধান নারী চরিত্রটি সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। সে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে মেধাবী হলেও শারীরিকভাবে অক্ষম, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করে। মানুষ তাকে কটু কথা শোনায়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে; তবুও সে দমে যায় না। সে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সব মানুষের মানবিক অধিকার অর্জনের জন্য লড়াই করে। তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আরও এক যুবক, যে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে। তাদের যৌথ সংগ্রামের গল্পই বলবে এই চলচ্চিত্র।

এর অর্থায়নে কারা ছিলেন?

সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)-এর অর্থায়নে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের মূল চিত্রনাট্য লিখেছেন ব্রিটিশ লেখক, প্রযোজক ও পরিচালক এলসপেথ ওয়েলডি। ইংরেজি চিত্রনাট্যটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন প্রযোজক হুমায়ূন ফরিদ। অনূদিত চিত্রনাট্যের সম্পাদনা ও সংলাপ যৌথভাবে লিখেছি আমি ও হুমায়ূন ফরিদ।

চলচ্চিত্রটির পোস্টার
এই ধরণের ইস্যুভিত্তিক ছবি কি দর্শক গ্রহণ করবে?


গল্পটি ইস্যুভিত্তিক হলেও আমি এটিকে সামাজিক ও বিনোদনধর্মী একটি চলচ্চিত্রই বলতে চাই। নাচ-গান সবই আছে এতে। আমি মনে করি, দর্শক আড়াই ঘণ্টা চলচ্চিত্রটি উপভোগ করবেন।

নির্মাতা হিসেবে কী দেখাতে চেয়েছেন এই চলচ্চিত্রে?

আসলে দেখুন, আমি চলচ্চিত্রটির মধ্য দিয়ে একটি বৈষম্যের গল্প বলতে চেয়েছি। আমরা মানুষকে দেখি তার বাইরের রূপ দিয়ে, তার ভেতরের শক্তিটাকে দেখি না। যে মানুষগুলো সারাজীবন এই অসুখটি বয়ে বেড়াচ্ছে, সমাজ তাদের কীভাবে বিচার করছে? এমন একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর একজন স্বামী কি তার স্ত্রীকে গ্রহণ করছেন? আমাদের সমাজব্যবস্থায় বৈষম্যটা যে শুধু বিত্তের তা কিন্তু না, আমাদের মননেও আমরা বৈষম্যকে লালন করছি।

কলাকুশলী কারা ছিলেন এতে?

চলচ্চিত্রটির প্রধান তিনটি চরিত্রে ছিলেন তিনজন 'সিপি পেশেন্ট' (সেরিব্রাল পালসি আক্রান্ত ব্যক্তি)। তাঁরা ছাড়াও গুণী অনেক অভিনেতা কাজ করেছেন বিভিন্ন চরিত্রে। যেমন—রাশনা শারমিন কেমি, তাহমিদ আরেফিন হক, তারিক আনাম খান, মিলি বাশার, মামুনুর রশীদ, রহমত আলী, গাজী রাকায়েত, শতাব্দী ওয়াদুদ, লারা লোটাস, কাজী নওশাবা, রাজীব সালেহীন, শর্মীমালা প্রমুখ।

চলচ্চিত্রটির দৃশ্য
শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এই মানুষগুলো কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করলো, এটি কীভাবে সম্ভব হলো?


তিনটি প্রধান চরিত্রের প্রত্যেকেই বাস্তবে এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁরা যে এত দুর্দান্ত অভিনয় করবেন, কখনো ভাবতে পারিনি। ওই যে বললাম, আমরা ভেতরের শক্তিকে দেখি না, শুধু বাইরের রূপ দেখে বিচার করি—তাঁরা অভিনয় দিয়েই সেটি ভুল প্রমাণ করেছেন। আর আমি এমনিতে আমার কোনো চলচ্চিত্রে খুব চেনা মুখ বা তারকা-নির্ভর কেন্দ্রীয় চরিত্র নিয়ে এগোই না। যেকোনো দর্শকের কাছে মনে হবে ‘এই ছবিটা আমার’। এখানেও তাই করতে চেয়েছি। তাঁদের অভিনয় দেখে দর্শক মুগ্ধ হবেন।

আগের চলচ্চিত্রগুলোর অর্জনের ধারাবাহিকতায় এটি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

আমি কখনোই পুরস্কারের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করিনি; চলচ্চিত্রগুলোই হয়তো তা অর্জন করে নিয়েছে। এই চলচ্চিত্রটিও দর্শক গ্রহণ করবে বলে মনে করি। এটি সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ধারার একটি চলচ্চিত্র, তবে মেকিং কিছুটা ভিন্ন। ইতোমধ্যে ট্রেলার ও গান প্রকাশ হয়েছে। সব মিলিয়ে আমি একটি মানবিক গল্প বলতে চেয়েছি। চলচ্চিত্র মানেই আমার কাছে মানবতা। বরাবরের মতোই আমি আশাবাদী।

চলচ্চিত্রের দৃশ্য
চলচ্চিত্রটি শুধু একটি হলে মুক্তি পাচ্ছে কেন?


আপাতত শুধুমাত্র যমুনা ব্লকবাস্টারে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাচ্ছে। ঈদুল আজহায় আরও বেশি হলে মুক্তি দেওয়া হবে। এখন তো ঈদের ছবি ‘নায়ক-নির্ভর’ হয়ে গেছে, আমরা সেই স্রোতে মিশতে চাই না। তবে চলচ্চিত্রটি নিয়ে আমরা বিভিন্ন স্কুলে যাব এবং ৬৪ জেলায় এটি প্রদর্শিত হবে।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
ভিডিওতে এআই, গানে মনোযোগ ফেরাতে শিরোনামহীনের নতুন কৌশল
ভিডিওতে এআই, গানে মনোযোগ ফেরাতে শিরোনামহীনের নতুন কৌশল
পাঁচ তারকার স্মরণীয় একদিন
পাঁচ তারকার স্মরণীয় একদিন
কলকাতায় ঘুরতে গিয়ে গুজবের শিকার হলেন মোশাররফ করিম
কলকাতায় ঘুরতে গিয়ে গুজবের শিকার হলেন মোশাররফ করিম
কসমিক রোমান্স ও স্পেস ড্রামা: ঢালিউডে নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন অংশু!
কসমিক রোমান্স ও স্পেস ড্রামা: ঢালিউডে নতুন ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন অংশু!
সাইবার বুলিং ও ট্রলকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন প্রভা
সাইবার বুলিং ও ট্রলকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন প্রভা