‘ডুব’ প্রচারণায় ফারুকীর ‘হ‌ুমায়ূন’ কৌশল?

Send
সুধাময় সরকার
প্রকাশিত : ১৯:৩৯, নভেম্বর ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪০, নভেম্বর ০৬, ২০১৬

হুমায়ূন আহমেদ, ফারুকী ও ইরফানগেল ৩৬ ঘণ্টায় ভারত হয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় তুলকালাম। বৃষ্টি বিঘ্নিত বিপিএল ইভেন্ট ছাপিয়ে মুখে-অন্তর্জালে প্রসঙ্গ একটাই- ‘ফারুকী-ডুব-হুমায়ূন-শাওন’। চলছে বাদানুবাদ।

কেউ বলছেন, এটা ফারুকীর অন্যায়। কেউ বা বলছেন, আগে ছবিটা দেখি। আবার কেউ কেউ দেখছেন, হুমায়ূন-ফারুকী বিতর্কের রেশ ধরে শীলা-শাওনের মধ্যকার পুরনো ‘ক্ষত’ নতুন করে জাগিয়ে তোলার হিসাব!

তবে যাই ঘটুক না কেন; এই ঘটনায় মোটাদাগে এখন প্রশ্নের ‘কাঠগড়ায়’ দাঁড়িয়ে আছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কারণ, তিনি যা বলছেন তার পুরোটাই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। যেটাকে কাঁচা বাংলায় ‘মিডিয়া মশকরা’ও বলা চলে। তাও সেটার শুরুটা করেছেন ভারতীয় পত্রিকা মারফত। এরমধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ভেরাইটি এবং আনন্দবাজার। কারণ, তিনি সম্ভবত আন্তর্জাতিক আবহটা ক্রিয়েট করতে চাইছেন। নয়তো দেশীয় মিডিয়ায় আস্থা কম।

এদিকে আনন্দবাজারের সূত্র ধরে ‘ডুব’ নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় গেল ৩৬ ঘণ্টার হইচই দেখে ঐ বাংলায় বসে মুচকি হাসছেন স্থানীয় মিডিয়া সংশ্লিষ্ট অনেকেই। যারমধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শনিবার এই প্রতিবেদককে ফোন দিয়ে বললেন, ‘ইউ পিপল ডুইং গুড জব। একটি ছবির প্রচারণার কৌশল চিত্রনাট্যে ঠিক যেভাবে লেখা হয়েছিল বছর খানেক আগে, সেটাই এখন তোমরা করে দেখালে নিজ নিজ উদ্যোগে। যদিও ভারতের মিডিয়ায় এখন আর এসব স্বস্তা ক্যাম্পেইন চলে না। এসব নিয়ে এখানে অনেক জলঘোলা হয়েছে আগে।’

ভারতের একটি নামকরা মিডিয়া হাউজের এই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘‘স্টার জলসায় মাত্রই শেষ হয়েছে প্রসেনজিৎ অভিনীত ‘মহানায়ক’ নামের একটি ডেইলিসোপ। আমি জানি, গোটা পৃথিবীর বাংলাভাষী দর্শক সিরিজটি যখন দেখেছেন তখন প্রিয় উত্তম কুমারের জীবনী ভেবেই সেটি দেখেছেন। কারণ, বিষয়টিকে সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ উত্তম কুমারের সত্যি জীবনের সঙ্গে এই সিরিজের ছিঁটেফোটাও মিল নেই। উত্তমকে ঘিরে কিছু রিউমার এবং লোকমুখে শোনা গল্পগুলোকে জড়ো করে সিরিজটি নির্মাণ হয়েছে, নামটা দিয়েছে ‘মহানায়ক’। এ নিয়ে উত্তমের নায়িকা সুপ্রিয়া এবং সাবেত্রীরা কত কান্নাকাটি করছেন- কিন্তু কেউ শুনছেন না! অন্যদিকে ‘মহানায়ক’ সংশ্লিষ্টরাও বলছেন- আমরা তো কোথাও বলিনি এটা উত্তমকুমারের বায়োপিক! এটা একজন কাল্পনিক নায়ককে নিয়ে রচিত। অথচ সিরিজটির মিডিয়া প্রচারণায় উত্তমকুমারের নামটাই এসেছে ঘুরে ফিরে। যে কথাটা এখন ‘ডুব’ নিয়ে ফারুকী বলার চেষ্টা করছেন।’’

আনন্দবাজারের ফটো ক্যাপশনএই সূত্র আরও বলেন, ‘এখানে মজার বিষয় হচ্ছে, ফারুকী কিন্তু একবারও সরাসরি হুমায়ূনের বিষয়টি অস্বীকার করছেন না। না সংবাদে, না নিজের স্ট্যাটাসে। এটাই হলো প্রচারণার নামে নতুন প্রতারণার ফাঁদ। যে ফাঁদে এখন পা রাখছে মিডিয়া এবং ছবিটি মুক্তির পর একই ফাঁদে পা দেবেন দর্শকরাও। ছবিটি দেখার পর দেখবেন- আসলে যেটি ধারণা করেছেন সেটির আসেপাশেও নেই। অথবা গল্পটি যদিও হুমায়ূন আহমেদের না হয়, তবুও মানুষ ধরেই নিবেন এটাই বোধয় হুমায়ূন কিংবা তার স্ত্রী-সন্তানদের আসল জীবনাচরণ। থাকলেও সেটিকে এমন ভাবে প্রেজেন্ট করা হয়েছে- তাতে মামলা-মকদ্দমারও সুযোগ থাকবে না।’ এই বলে বলিউড-টলিউডের এমন অন্তত ডজন খানেক উদাহরণ তুলে ধরেন ঐ ব্যাক্তি।

এদিকে ভারতের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন, হুমায়ূন আহমেদের জীবনের একটি অংশ নিয়েই ছবিটি নির্মিত হচ্ছে- এতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে চরিত্রের নাম এবং বাস্তব গল্পের মধ্যে কিছু পরির্তন এসেছে সচেতনভাবেই। আর শাওন এবং শীলা আহমেদের মন্তব্য নিয়ে আনন্দবাজারের খবরটিও প্রকাশ হয়েছে একরকম টেস্ট-কেস হিসেবে। ছবি সংশ্লিষ্টরা দেখতে চেয়েছেন- হূমায়ূন পরিবার ও ভক্তদের রি-অ্যাকশন, সঙ্গে ফ্রি প্রচারণা তো থাকছেই।

ছবিটির পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে জানেন এমন একজন জানিয়েছেন, ‘ডুব’ ছবিটি মূলত দাঁড়িয়ে আছে দুটি চরিত্রের মধ্যে। একজন ইরফান খান অন্যজন তিশা। যেখানে দু’জনের সম্পর্ক বাবা আর মেয়ের। তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন এই ছবির উপজীব্য। যাদের একজনের মধ্যে পাওয়া যাবে হুমায়ূন আহমেদের ছায়া এবং অন্যজনের মধ্যে শীলা আহমেদ। এই সূত্র আরও বলছে, ছবিতে ইরফান খানের নাম রাখা হয়েছে জাবেদ হাসান। যিনি মূলত রাইটার এবং ফিল্মমেকার। যার প্রথম স্ত্রীর নাম মায়া। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রোকেয়া প্রাচী। সম্ভবত ছবির শুরুটা হয় মায়ার কাছে একটা ফোন কলের দৃশ্য দিয়ে। যে ফোনের মাধ্যমে কেউ একজন তাকে জানান, ‘আপনার এক্স হাজবেন্ড জাবেদ মারা গেছেন। যিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন এতদিন।’ ছবিতে আরও স্থান পাচ্ছে জাবেদ হাসানের সঙ্গে তার দ্বিতীয় স্ত্রী পার্নো মিত্রর সঙ্গে প্রেম-রোমান্স এবং বিয়ের বিষয়টিও। যেটিকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেননি জাবেদ হাসানের কন্যা তিশা। তৈরি হয় বাবা-মেয়ের বিরোধ এবং দূরত্ব।

‘ডুব’-এ হুমায়ূনের ছায়া আছে কি নেই- ফারুকীর কাছে স্পষ্ট জবাব চান শাওনবিষয়টি কাকতালীয় না সচেতনভাবে- তার দায়িত্ব পাঠক বা দর্শকের। তবে হ্যাঁ, হুমায়ূন আহমেদ তো ক্যানসারেই মারা গেছেন। তার দুই সংসার-সন্তান, শাওনের সঙ্গে প্রেম-বিয়ে, এটা নিয়ে শীলার বিরুদ্ধাচরণ, মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে বিতর্ক- এসব বিষয়ে অনেক গুঞ্জনই তো রয়েছে মিডিয়ায়। আর এর সবটাই তো থাকছে ফারুকী-জাবেদ হাসানের গল্পে!

এদিকে ভারতে ভ্যারাইটি পত্রিকায় চলতি বছরের ৩ মার্চ ‘ডুব’-এর গল্প সম্পর্কে ফারুকী বলেন, ‘মৃত্যু শুধু সব নিয়ে নেয় না। অনেক কিছুই ফিরিয়ে দেয়। ভালোবাসা, একত্র হওয়া-সব। আমার নতুন ছবির গল্পটা একটি মৃত্যুকে ঘিরে। দুইটি পরিবারের প্রধান কর্তার মারা যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের নানা গল্প উঠে আসবে এখানে।’

এরপরও কি ফারুকীকে মুখ ফুটে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে- গল্পটা কি হুমায়ূন আহমেদের জীবন থেকে নেওয়া? এরপরও কি তার এমন কোনও উত্তরের অপেক্ষায় থাকা উচিত- ‘হুম এটা হুমায়ূন আহমেদের জীবন ছায়া থেকেই তিনি বানিয়েছেন। এটাই হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমার চোখভেজা ভালোবাসার ভিজ্যুয়াল নিদর্শন!’ তবে এ প্রশ্নগুলো ফারুকীকে নয়, পাঠককে করা যেতেই পারে, কারণ সবাই তো দ্বিধাগ্রস্ত।

সুতরাং মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার স্পর্শকাতর গল্প হান্ট এবং অভূতপূর্ব প্রচারণার বিচারে ছবিটি মুক্তির আগেই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মাঠে দুই গোলে এগিয়ে আছেন। যদিও শেষ বাঁশি বাজার আগে এই সংখ্যায় ঠিক কতটা হেরফের হয়, হাততালিই বা কতোটা মেলে- সেটা বলা মুশকিল।

কারণ, একজন হুমায়ূন আহমেদ তার কলমের আবেগ ছড়িয়ে বসে আছেন দুই বাংলায় বিস্তৃত গ্যালারিজুড়ে। 

‘ডুব’ ছবির আসরে ইরফান খানের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচী, তিশা ও পার্নো মিত্র।/এমএম/

আরও পড়ুন: ফারুকীর ইনটেনশন ভালো না: শাওন

লাইভ

টপ