জব্বারকে জোর করায় ‘ওরে নীল দরিয়া’ গেয়েছিল: আলম খান

Send
জনি হক
প্রকাশিত : ০০:০১, আগস্ট ৩১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৪, আগস্ট ৩১, ২০১৭

আবদুল জব্বার ও আলম খান (ছবি-সংগৃহীত)স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে আবদুল জব্বারের অবদান ভোলার নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গণে যাওয়ার উৎসাহ দিয়েছে যেসব গান, সেগুলোর মধ্যে তার ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ অন্যতম।

ষাটের দশক থেকে দেশাত্মবোধক, প্রেম ও বিরহের গানে সংগীত পিপাসুদের মন ভিজিয়েছেন আবদুল জব্বার। জীবদ্দশায় দরাজ কণ্ঠের এই শিল্পী গেয়েছেন ছয় হাজারেরও বেশি গান। এর মধ্যে সবশ্রেণির সবচেয়ে প্রিয় ‘ওরে নীল দরিয়া’। সত্তর দশকের কালজয়ী এই গান আজও সমান আকুল করে তোলে শ্রোতাকে।

এর সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছিলেন প্রখ্যাত সংগীত ব্যক্তিত্ব আলম খান। বুধবার (৩০ আগস্ট) সকালে আবদুল জব্বারের চিরবিদায়ের খবর শুনে তার বাসায় ছুটে যান তিনি। বিকালে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আলম খান তুলে ধরলেন ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি তৈরির গল্প। চলুন পড়ি তার বয়ানে...

“১৯৭৮ সালের কথা। আবদুল জব্বার তখন সংগীত চর্চা করে না। গান-বাজনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’ ছবির ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটা তাকে দিয়েই গাওয়াবো ঠিক করি। কারণ জব্বারকে মাথায় রেখেই গানটা সুর করেছিলাম। আমার চোখের সামনে ভাসছিল— ও গাইছে! তাই অনেক বলেকয়ে একরকম জোর করে তাকে গাইতে রাজি করালাম। মানুষ হিসেবে আবদুল জব্বার কিছুটা উদাস আর একরোখা ছিল।

‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের অস্থায়ী সুর অবশ্য কোনও ছবির কথা ভেবে করিনি। ১৯৬৯ সালে একদিন সুরটা মাথায় আসে। কিন্তু এটা কয়েক বছর কোনও ছবিতে কাজে লাগাইনি। আবদুল্লাহ আল মামুন ‘সারেং বউ’ ছবির গল্প শুনে ভাবলাম এই সুরে এবার গান বানাবো। গল্পটা এমন— গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরছে সারেং। তার স্ত্রী তা স্বপ্নে দেখছে।আবদুল জব্বারের মৃত্যুর খবর শুনে তার বাসায় যান আলম খান (ছবি-সাজ্জাদ হোসেন)

সুরটা শোনালাম গীতিকার মুকুল চৌধুরীকে। তিনি সুরের ওপর ‘ওরে নীল দরিয়া’র পুরো মুখরা লিখে দেন। এর দুই দিন পর গল্প অনুযায়ী অন্তরাসহ লিখে নিয়ে এলেন। তাঁর কথার ওপরই সুর করি।

পরিচালক জানালেন— গানের প্রথম অন্তরায় রেলগাড়িতে, দ্বিতীয় অন্তরায় সাম্পানে চড়ে এবং সবশেষে মেঠোপথ ধরে সারেং বাড়ি ফিরবে। তাই ট্রেনের ইফেক্ট, সাম্পান, বৈঠা, পানির ছপছপ শব্দ এবং একতারার ইফেক্ট তৈরি করলাম।

পানির ছপছপ শব্দ তৈরির জন্য গামলা ভরে পানি নিয়ে এলে আবদুল জব্বার বললো, ‘এটা দিয়ে কী করবা?’ তাঁকে বললাম— দেখো কি করি। সে তো অবাক! কাকরাইলের ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটির রেকর্ডিং হয়েছিল।

মুক্তির পর ‘ওরে নীল দরিয়া’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর আমার সুরে আরও কয়েকটি গান গেয়েছে আবদুল জব্বার। সবশেষ সে গেয়েছিল ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ ছবির ‘তুমি আছো সবই আছে’। ওর গায়কীর তুলনা হয় না।

আবদুল জব্বার চলে গেছে, খুব খারাপ লাগছে। ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের গীতিকার মুকুল চৌধুরী এবং ‘সারেং বৌ’ ছবির পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনও নেই, আমাকেও একদিন নিয়তির কাছে চলে যেতে হবে। তারা যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক। শান্তিতে থাকুক।”

* দেখুন ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের ভিডিও:

‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের কথা
শিল্পী: আবদুল জব্বার
গীতিকার: মুকুল চৌধুরী
সুর: আলম খান
ছবি: সারেং বউ (১৯৭৮)

ওরে নীল দরিয়া
আমায় দেরে দে ছাড়িয়া
বন্দি হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া।

কাছের মানুষ দূরে থুইয়া
মরি আমি ধড়-ফড়াইয়ারে।
দারুণ জ্বালা দিবানিশি
অন্তরে অন্তরে
আমার এত সাধের মন বধূয়া হায়রে
কি জানি কি করে।

ওরে সাম্পানের নাইয়া
আমায় দেরে দে ভিড়াইয়া
বন্দি হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া
ওরে সাম্পানের নাইয়া।

হইয়া আমি দেশান্তরী
দেশ-বিদেশে ভিড়াই তরীরে
নোঙর ফেলি ঘাটে ঘাটে
বন্দরে বন্দরে
আমার মনের নোঙর পইড়া আছে হায়রে
সারেং বাড়ির ঘরে।

এই না পথ ধইরা
আমি কত যে গেছি চইলা
একলা ঘরে মন বধূয়া আমার
রইছে পন্থ চাইয়া।

/জেএইচ/

লাইভ

টপ