সিনেমা সমালোচনাগণ্ডি: বাইরে কলকাতার গন্ধ, ভেতরে ঢাকা-কলকাতা একাকার

Send
মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত : ১১:৫০, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৪, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

একটি দৃশ্যে সুবর্ণা মুস্তাফা ও সব্যসাচী চক্রবর্তীআমাদের দেশের সিনেমা-উন্মত্ত শ্রেণির একটা অংশ কলকাতার মাল্টিপ্লেক্সমুখী দর্শকদের ঈর্ষা করেন। কলকাতার ছবিতে নাগরিক জীবনের চেহারা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের যে বাঁকবদল হয়, তার বিচিত্র বয়ান সেখানকার ছবিতে মেলে। কলকাতার ছবি শহরের শত সংকটকে ধারণ করতে না পারলেও মধ্যবিত্তের আশীর্বাদপুষ্ট। এই শ্রেণিটির সম্পর্কের চোরাগলিতে কলকাতার ছবি ঢুকে পড়তে পারে অনায়াসে।

শহর কলকাতার একটা সুখ সুখ অবয়ব সেখানকার ছবিতে দেখে দেখে ঢাকার দর্শকরা এমন ধারার ছবির প্রতি দুর্বলতা অনুভব করেন, হয়তো। শহরের ক্লেদাক্ত, ঘিনঘিনে, পচনশীল অবস্থার খুঁতহীন বর্ণনায় জ্বলজ্বলে ছবির চেয়ে তাদের পক্ষপাত শহুরে মধ্যবিত্তের সাজানো, তকতকে, পরিপাটি জীবনে সম্পর্কের অনিশ্চিত যাত্রার বর্ণনায় ঝকঝকে ছবির প্রতি।
নির্মাতা ফাখরুল আরেফীন দর্শকদের এই অংশের চাহিদাকে আত্মস্থ করে তাদের তৃষ্ণা মেটাতে এগিয়ে এসেছেন। কলকাতার মাল্টিপ্লেক্স-হিট-ছবির মেজাজকে অনুসরণ করে ঢাকার এই নির্মাতা বানালেন ‘গণ্ডি’। এজন্য ‘গণ্ডি’র শরীরে কিংবা বাইরে কলকাতার গন্ধ, কিন্তু ছবির ভেতরে বা অন্তরে ঢাকা-কলকাতা একাকার। সম্পর্কের সংকট, তা দুনিয়ার যে শহরেরই হোক না কেন, সেই গল্প বুনতে পারলে, আর কোনও প্রশ্নই যে চলে না!
‘গণ্ডি’, পঁয়ষট্টি বছরের অবসরপ্রাপ্ত এক বিপত্নীকের সঙ্গে এক প্রবীণার সম্পর্কের সীমানা-বিরোধের সাতকাহন। সব্যসাচী চক্রবর্তীর স্ত্রী সাবেরী আলম ক্যানসারে দুনিয়া থেকে ছুটি নিয়েছেন। ছেলে মাজনুন মিজান থিতু হয়েছেন লন্ডনে। স্ত্রী অপর্ণা ঘোষের সঙ্গে তার এগারো বছরের প্রবাস-সংসার। এই দম্পতির একমাত্র মেয়ের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলে দিনের অন্যতম সুখটুকু জুটিয়ে নিয়ে বাঁচতে হচ্ছিলো সব্যসাচীকে। এমনই দিনে মেঘ কেটে রোদের উজ্জ্বলতায় তার জীবনে আসেন সুবর্ণা মুস্তাফা। পাঁচ বছর আগে বিমান-দুর্ঘটনায় গত হয়েছেন তার স্বামী। একমাত্র মেয়ে শিপ্রা থাকেন লন্ডনে। বড় ব্যবসায়ী পরিবারের বয়স্কা সুন্দরী সুবর্ণা। তার চলনে, কথনে আভিজাত্যের ছোঁয়া। তার সৌখিন দন্ত চিকিৎসকের পরিচয়টা চেপে, ঢেকে রাখতেই উৎসাহী তিনি। ঘটনে, অঘটনে সুবর্ণার কাছাকাছি আসেন সব্যসাচী। দুই নিঃসঙ্গ নক্ষত্র একই কক্ষপথে আবর্তন শুরু করেন। একটা সময় দুজনের সম্পর্কের কথা জানতে পারে দুজনের পরিবার। এর ফলে দুজনের সম্পর্কের একটা হেস্তনেস্ত হয়, তার স্বরূপ কেমন জানতে হলে ‘গণ্ডি’ দেখতে হবে থিয়েটারে বসে।
‘গণ্ডি’র নির্মাতা সম্পর্কের গণ্ডি পেরুনোর গল্প বললেও নিজের জন্য একটা নিরাপদ গণ্ডি এঁকে নিয়েছেন। যার বাইরে তিনি পা ফেলতে চাননি সচেতনভাবেই। ‘গণ্ডি’র  প্রধান পুরুষ আলী আজগর স্মৃতিভ্রষ্টতার কাছে ক্রমশ আত্মসমর্পণ করছেন। তার জীবন হয়ে উঠছে ঘড়ির কাঁটা ধরে একাকী, একঘেয়ে। কিন্তু চরিত্রটি তার অন্তর্জ্বালার কথা চিৎকার করে বলছে না। ‘গণ্ডি’র প্রধান নারী চরিত্র শামীমা উচ্চকিত বেশ-ভূষার আড়ালে লুকাতে চাইছেন তার একাকিত্বের ভার। তামাকের ছোট্ট ছোট্ট চুমুকে তিনি ভুলতে চাইছেন তার না-পাওয়ার হিসেব। কিন্তু চরিত্রটি তার অতৃপ্তির কথা জোরেশোরে বলছে না।
নির্মাতা গল্পের চরিত্রগুলোর দীর্ঘশ্বাসকে সামাজিক সমস্যা বলে তুলে ধরে দর্শকের আরামকে কোথাও আহত করতে চাননি। উন্নত জীবনের হাতছানির জেরে সমাজের একটা শ্রেণির একটা বিশেষ অংশ কীভাবে ভুগছে, তার কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে দর্শকের ভোঁতা অনুভূতিকে নাড়িয়ে দিতে চাননি নির্মাতা। দর্শককে আঘাত করে, তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়, বিবেককে নাড়া খাওয়ায়, ভেতরটাকে দুমড়ে দেয়, এমন কোনও দৃশ্যই নির্মাতা সৃষ্টি করেননি। দর্শকের চোখে আঙুল দিয়ে কোনও কিছু দেখানোর চেষ্টা ছিল না। দর্শককে ধাক্কা দেয়ার কোনও প্রবণতা নেই। দর্শকের কাছে সমাজ পাল্টানোর কোনও বারতাও পৌঁছে না। নির্মাতা একটা নিরাপদ কোণ বেছে নিয়ে সেখানেই তার গল্পের গণ্ডিকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
নির্মাতা একটি প্রশ্নের দিকে দর্শককে আলগোছে ঠেলে নিয়ে গেছেন, সে-ও এমন মৃদু-মন্দ ছন্দের সঙ্গে, যাতে দর্শক কোনোভাবে পীড়িতবোধ না করেন।

দুজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে এমন কোনও সম্পর্ক কি তৈরি হতে পারে, যার কোনও গণ্ডি নেই? বয়স যাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত থাকার কারণ, বয়স যাদের নতুন সম্পর্কে জড়ানোর ব্যাপারে এনে দিয়েছে অস্বস্তি, বয়স যাদের আটকে ফেলেছে একটা নিয়মধরা জীবনে, সেখান থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের মতো উদার কোনও সম্পর্কের যৌথ খামার কি গড়ে নিতে পারেন কোনও নারী-পুরুষ? আর তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ছোট ছোট ঢেউগুলোর আঘাত সামলে কি শেষ পর্যন্ত তারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন বালুকাবেলায়? এটুকুই নির্মাতার নিজস্ব গণ্ডি। এটুকুতেই নির্মাতা অবাধে বিচরণ করেছেন।
দর্শকের স্বাচ্ছন্দ্যকে আঘাত না-করার যে প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন নির্মাতা, তাকে অক্ষরে অক্ষরে পুরো গল্পে তিনি মেনে চলেছেন। এক আশ্চর্য পরিমিতির মধ্যে নির্মাতা নিজেকে বেঁধে নিয়েছেন। যেখানেই গল্প উঁচু তারে উঠতে চেয়েছে, নির্মাতা তাকে টেনে নামিয়েছেন। যেখানেই চরিত্র সংযম হারাতে বসেছে, নির্মাতা তার রাশ টেনে ধরেছেন। যেখানেই সংলাপ নাটকীয় হওয়ার ভীতি জেগেছে, নির্মাতা তাকে দৌড়ে আটকেছেন। চিত্রনাট্যের কোথাও পরিমিতির সামান্য অভাব হতে দেননি নির্মাতা ।
‘গণ্ডি’র চিত্রনাট্যের গতি বয়সী মানুষের হৃদয়ের গতির সমান। তারুণ্যের উচ্ছল, উদ্বেল ঝরনার মতো নয়, বার্ধক্যের শান্ত, স্থির সাগরের মতো বয়ে গেছে ‘গণ্ডি’র চিত্রনাট্য। বর্ষার খ্যাপা নদীর মতো দু’কূল ভাসিয়ে এর চলা নয়, শীতের স্তব্ধ নদীর মতো কুল কুল করে এর এগিয়ে চলা। এ ছবির ক্যামেরা চরিত্রগুলোর মনোজগতের নির্জনতাকে ধারণ করতে পেরেছে। কোথাও কোনও দেখনদারি নেই। চমকের চাকচিক্য নেই। চরিত্রগুলোকে নীরবে অনুসরণ করে গেছে এ ছবির ক্যামেরা। ‘গণ্ডি’র সম্পাদনাও ক্যামেরার সঙ্গে আঁতাত করে গল্পের গতিকে সামনে এগিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোনও তাড়া নেই। কাঁচির অহেতুক বাহাদুরি নেই। গল্পকে তার গন্তব্যের দিকে ছুটে যাওয়ার পথে বিশ্বস্ত সঙ্গী হতে পেরেছে সম্পাদনা।
‘গণ্ডি’র গল্পে প্রাণ আছে, প্রাচুর্য আছে, এমনকি গানও আছে। গানগুলো গল্পকে থামিয়ে দেয়নি, গল্পের ছন্দকে সঙ্গত করেছে। যখন একটা নতুন সম্পর্ক সুর খুঁজে পাচ্ছিলো, যখন সম্পর্কের তালে গরমিল হচ্ছিলো, তখন-তখনই সংগীত এসে অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করে দিচ্ছিলো, নয়তো শূন্যতাটুকু ভরে দিচ্ছিলো। এর কিছুটা হয়েছে গানের কথার ভেতর দিয়ে, আর অনেকখানি হয়েছে আবহ সুরের ভেতর দিয়ে।
‘গণ্ডি’র সুরেবাঁধা গল্পকে প্রাণ দিয়েছেন এর অভিনয় শিল্পীরা। ছবির প্রাণপুরুষ আলী আজগরের ভূমিকায় বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। শামীমার ভূমিকায় সুবর্ণা মুস্তাফাও চরিত্রানুগ অভিনয় করেছেন। তবে গল্প ঝুঁকে ছিল সব্যসাচীর দিকে। সব্যসাচীর ছেলের চরিত্রে মাজনুন মিজান দ্বিধাগ্রস্ত সংসারকর্তার ভূমিকায় মন্দ করেননি। পুত্রবধূর চরিত্রে অপর্ণা ঘোষ কর্তৃত্বপরায়ণ গিন্নির ভূমিকায় যথাযথ। মিজান-অপর্ণার অসুখী দাম্পত্যের ফসল একমাত্র মেয়েটির চোখে-মুখে যে বেদনার ঘনঘটা, তাকে ফুটিয়ে তোলায় শিশুশিল্পী ঋদ্ধি দর্শকের কাছ থেকে প্রচুর চকোলেট পাওনা রইলো।
অল্পকিছু চরিত্রের অল্প-স্বল্প বেদনার ছবি ‘গণ্ডি’। ছবির কোথাও কোনও দুঃসহ বিরহ নেই। সুখের ও বিত্তের ছাপ সর্বত্র। ছবির পরতে পরতে রুচির চিহ্ন। চরিত্রগুলোর পোশাকে রুচি। আসবাবপত্রে রুচি। গাড়িতে রুচি। ঢাকার নোংরা লেগে নেই কোথাও। সযতনে সব ক্লেদ এড়িয়ে পরিচ্ছন্ন এক শহরের গল্প ‘গণ্ডি’। সবশেষে, একটা পরিচ্ছন্ন সম্পর্কের বিজয়কেতন উড়িয়ে ‘গণ্ডি’ মিলিয়ে যায় থিয়েটারের অন্ধকারে।

গণ্ডি: রিভিউ রেটিং- ৭/১০
পরিচালক: ফাখরুল আরেফীন
প্রযোজক: ফাখরুল আরেফীন ও ইশরাত সুলতানা
গল্প: শুভজিৎ রায়
সংলাপ: ফাখরুল আরেফীন
চিত্রনাট্যকার: ফাখরুল আরেফীন
শ্রেষ্ঠাংশে: সব্যসাচী চক্রবর্তী, সুবর্ণা মুস্তাফা, অপর্ণা ঘোষ, মাজনুন মিজান, ঋদ্ধি, পায়েল মুখার্জি প্রমুখ
সংগীত পরিচালক: দেবজ্যোতি মিশ্র ও দীপ-লয়
আবহসংগীত: দেবজ্যোতি মিশ্র
চিত্রগ্রাহক: রানা দাসগুপ্ত ও কুশাল শেস্ট্রা
সম্পাদক: মুস্তফা প্রকাশ
প্রযোজনা: গড়াই ফিল্মস
পরিবেশক: টিওটি ফিল্ম
মুক্তি: ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিট
ভাষা: বাংলা

লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ