‘এক্সট্র্যাকশন’ ছবিতে যেভাবে যুক্ত হলেন আট বাংলাদেশি র‌্যাপার

Send
ওয়ালিউল বিশ্বাস
প্রকাশিত : ২২:২৬, এপ্রিল ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২৯, এপ্রিল ২৭, ২০২০

সাইফার বাংলা ও ব্ল্যাক জ্যাঙ্গ

হলিউড আর ঢাকা—বছরজুড়েই এ নিয়ে বেশ হইচই। শোনা গিয়েছিল হলিউড ছবিতে ঢাকার গল্প থাকছে। ছবির নাম ‘এক্সট্র্যাকশন’। পর্দায় থাকবে না কোনও অভিনেতা বা নির্মাতার ছোঁয়া। কিন্তু সেখানে যে বাংলার লাল পাহাড়ের সুর শোনা যাবে, তা কে জানতো!
গত ২৪ এপ্রিল ছবি মুক্তির পর বোঝা গেল, সেখানে কাজ করেছেন একদল র‌্যাপার। পুরো ছবিতে যত্রতত্র কলকাতার কথার টান, তাই তখনও হয়তো অনেকে ভেবেছেন, গানের কাজটিও ওপারের কেউ করে দিয়েছেন। আর এটা তো র‌্যাপ! হতেই পারে!

না। ‘এক্সট্র্যাকশন’ ছবিতে ব্যবহার হয়েছে দুটি র‌্যাপ গান। যার সবটুকুই করেছেন বাংলাদেশের র‌্যাপাররা। তাও কারও বাড়ি ঢাকায়, তো কারও সাভার। আছেন কুমিল্লারও একজন।

দুটির মধ্যে ‘নো বাউন্ডারিস’ গানটি করেছেন ব্ল্যাক জ্যাং। যার পুরো নাম আসিফুল ইসলাম সোহান। বাংলাদেশের র‌্যাপ গান নিয়ে যে দু’-চারজন তরুণ আন্তর্জাতিক নজর কাড়তে পেরেছেন, তার মধ্যে তিনি অন্যতম।

আর ছবির একদম শেষে ক্রেডিট লাইনের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজানো হয় ‘বাংলা সাইফার ২০১৬’ গানটি।

এটি তৈরি করেছেন আরও সাত র‌্যাপার। বয়সে কেউ কেউ মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে ঘোরাফিরা করেন। এরা হলেন, সম্রাট সিজ, গোলাম, ইরফু জি, নিজাম রাব্বি, ভিএক্সএল (ভিশাল), দর্পণ আরভিএস ও ইফতেখার। তারা মূলত বিভিন্ন এলাকার।

সম্রাট সিজ, গোলাম, ইরফু জি, নিজাম রাব্বি, অ্যারডি ভিএক্সএল (ভিশাল), দর্পণ আরভিএস, পাঙ্কস্থ।


আর গান দুটি আগেই তারা প্রকাশ করেছিলেন। এগুলোই ছবির জন্য নির্বাচন করা হয়। গানের পেছনের কারিগরদের সারসংক্ষেপ মূলত এটিই। এ তো গেল পরিচিতি পর্ব। কিন্তু হলিউডের নির্মাতা স্যাম হারগ্রেভ বা নেটফ্লিক্স কর্তৃপক্ষই বা কীভাবে তাদের পেলেন!

যেভাবে হলিউড আর বাংলা র‌্যাপের যোগ
ফেব্রুয়ারি মাসের কোনও একদিন ছবিটির ট্রান্সলেটর কোচ ও হলিউড ছবির অ্যানিমেটর কর্মী ওয়াহিদ ইবনে রেজা ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেন। সেখানে জানান, কিছু বাংলা র‌্যাপারকে দরকার তার।

বিষয়টি নজরে আসে ব্ল্যাক জ্যাং সোহানের। কিছুটা সংশয় নিয়ে নিজের গানের কথাটি জানান তিনি। কিন্তু ওয়াহিদ যেন পাল্টা চমকে দেন। বলেন, তার ‘নো বাউন্ডারিস’ গানটি ওয়াহিদের লিস্টে আছে!

কীভাবে সেই তালিকা তৈরি কিংবা কিসের জন্য এ তালিকা- তখনও তেমন কেউ কিছু জানেন না।

ব্ল্যাক জ্যাঙ্গ

নেটফ্লিক্সের এ ছবিতে গান রাখার প্রস্তাবটি ছিল ওয়াহিদের। তিনি চাচ্ছিলেন বাংলা গান থাকুক। বিষয়টি নেটফ্লিক্সও গ্রহণ করে। আর প্রতিষ্ঠানটি চাচ্ছিল, যেন এটা অরিজিনাল বাংলা ও র‌্যাপ গান হয়। প্রথমে একটি গান যুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু পরে আরও একটি যোগ করা হয়।

তালিকাটি নিয়ে কাজ করছিল দেশি হিপহপের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিজে র‌্যাফ ও হারডিক ডেইভও।

বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের র‌্যাপ গান প্রমোট করে। তারা বিভিন্ন শিল্পীর গান ও বায়োডাটা দেয় নেটফ্লিক্সকে।

ঠিক একই কারণে দেশি হিপহপ যোগাযোগ করে ‘সাইফার বাংলা’ গানের তরুণদের সঙ্গে।

ব্ল্যাক জ্যাং সোহান আগে জানলেও অনেক পরে এরা জানতে পারেন নেটফ্লিক্সের একটি প্রজেক্টে তাদের গান জমা দেওয়া হয়েছে।

যখন জানতে পারলেন হলিউড ছবিতে থাকছে গান

২৪ এপ্রিল ‘এক্সট্র্যাকশন’ মুক্তি পায়। তার ঠিক একদিন আগে বিষয়টি জানতে পারেন ‘সাইফার বাংলা’র র‌্যাপাররা। বিষয়টি নিয়ে এ গানের র‌্যাপার ভিএক্সএল ওরফে ভিশাল বলেন, ‘‘ছবি মুক্তির সপ্তাহ খানেক আগে দেশি হিপহপ থেকে র‌্যাপার নিজাম রাব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু তার বাসায় নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে সে বিষয়টি বুঝতে পারেনি। এরপর প্রতিষ্ঠানটি থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ছবিটি মুক্তির একদিন আগে আমি জানতে পারি, ‘এক্সট্র্যাকশন’-এ আমদের গান থাকছে। আমরা তাদের পাঠানো চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করে দ্রুত হস্তান্তর করি। যখন শুনলাম, গানটি ‘এক্সট্র্যাকশন’ ছবির জন্য যাচ্ছে আমাদের আনন্দ আর ধরে না।’’

অন্যদিকে ওয়াহিদ ইবনে রেজা ও দেশি হিপহপের মাধ্যমে সোহান জানতে পারেন তার গান নির্বাচিত হয়েছে।

নো বাউন্ডারিস


২০১৭ সালে যুক্তরাজ্য সফরে সোহান এটির কাজ শুরু করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় র‌্যাপার ডিএমসি। দেশে ফিরে এসে এর সংগীতের কাজটি করেন সোহান। ব্যবহার করা হয় পাহাড়ি বাঁশির সুর। গানটি নিয়ে এই র‌্যাপার বলেন, ‘‘২০১৭ সালে দেশি হিপহপের মাধ্যমে এশিয়ার ৬ র‌্যাপার ও ইউকের ৬ র‌্যাপার আন্তর্জাতিক মিউজিক ট্যুর দেয়। সেখানে কাজ করতে গিয়েই গানটি শুরু। এর সংগীত করি দেশে। পাহাড়ি বাঁশির সুর কেটে অন্যরকম একটা শব্দ আনা হয়। আর এর ভিডিও ধারণ হয়েছে লন্ডন ও প্যারিসে। সম্পাদনা হয় প্যারিস ও ঢাকায়। এর সহ-গায়িকা আবার ভারতের। সব মিলিয়ে গানটির নাম দিই ‘নো বাউন্ডারিস’। পাহাড়ি বাঁশিটাই হিপহপের সঙ্গে আলাদা একটা মাত্রা দেয়। গানটির কম্পোজার হিসেবে আছেন সাইফ আই।’’
২০১৮ সালে প্রকাশিত এ গানে ভারতীয় ডিএমসি ও বাংলাদেশি ব্ল্যাক জ্যাং (সোহান) কণ্ঠ দেয়। ‘এক্সট্র্যাকশন’ ছবিতে শুধু সোহানের অংশটুকু ব্যবহৃত হয়েছে।
চলচ্চিত্রটির নায়ক ক্রিস হেমসওর্থ যখন অপহৃত কিশোরকে নিয়ে ম্যানহোলে আশ্রয় নেন, তখন তাকে উদ্ধার করতে আসা গাড়িতে এ গানটি বাজানো হয়।

সাইফার বাংলা ২০১৬

গানটির ভিডিও ২০১৬ সালে মুক্তি পায়। এটি মূলত সাত এলাকার সাতজন র‌্যাপারের যৌথ উদ্যোগ। বিষয়টি নিয়ে দর্পণ আরভিএস বলেন, ‘‘ভিএক্সএল (ভিশাল) অনেকদিন ধরেই বলছিল, ‘সবাই মিলে নতুন একটা গান করি।’ মূলত তারই উদ্যোগ ছিল। সেখানে আমি তাকে বলি, ‘এক কাজ করি, প্রতিটি এলাকার র‌্যাপার হেডকে এই গানে নিই।’ ঠিক এভাবেই বিভিন্ন এলাকার র‌্যাপার এতে যুক্ত হয়। এ গান তৈরির পেছনের গল্পে ব্ল্যাক জ্যাং (সোহান) ভাইয়েরও অবদান আছে। তিনি তখন কালারস এফএম-এ ‘প্লানেট হিপহপ’ নামের একটি শো করেন। তার শোতে আমরা যেতাম। র‌্যাপ নিয়ে আমাদের অনেক সিরিয়াস আলাপ হতো। এরপর যখন এটি তৈরি হলো তাকেও গানটি দেই। এমনকি ভিডিওটিও তৈরি হয়েছে কালারস এফএমের রাস্তায়। পরিচিত ভাই সাজান এস আলাম ভিডিওটি তৈরি করে দেন। আর ভাইব্রাদাররা দেয়ালে গ্রাফিতিও করে দেয়। এভাবেই ভিডিওটি তৈরি হয়। গানটির কম্পোজার হিসেবে ছিলেন আরডোনেক্স।’’

র‌্যাপারদের পরিচিতির বিষয়ে ভিএক্সএল (ভিশাল) জানান, তিনি নিজে মগবাজারের। একই জায়গার বিভিন্ন মহল্লার আছেন- সম্রাট সিজ ও ইফতেখার। গোলাম হচ্ছেন ফার্মগেট এলাকার, ইরফু জি কুমিল্লার, নিজাম রাব্বি বাসাবোর ও দর্পণের বাড়ি সাভারে।

কেমন সাড়া মিলছে

এমন প্রশ্ন দুটি গানের গায়কদেরই করা হয়েছিল। সোহান বলেন, ‘এটা তো বিশাল পাওনা আমাদের জন্য। খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। অন্তত এই বার্তা দিতে পেরেছি, আমাদের দেশেও প্রচুর ট্যালেন্ট আছে। শুধু গানে নয়, চলচ্চিত্র বা নাটকেও আছে। আমরা চাইলে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়েরও কাজ করতে পারি।’

দর্পণের ভাষ্য, ‘একটা সময় বিভিন্ন প্রজেক্টে অনেকে আমার র‌্যাপ নেওয়ার কথা বলতেন। আশায় থাকতাম। কিন্তু নানা কারণে এগুলো বাতিল হয়ে যেত। খারাপও লাগত। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিই, নিজে যা পারি- ততটুকুই নিয়ে নিজের গানে থাকব। হলিউডের ছবিতে নিজের গান স্থান পাওয়াতে পুরনো সব আক্ষেপ দূর হয়ে গেছে। আমরা হয়তো বোঝাতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক মানের কাজ বাংলাদেশি র‌্যাপারও করতে পারেন।’

পারিশ্রমিক

প্রথমেই বলে নেওয়া হয়েছিল, তাদের পারিশ্রমিকের অংকটা প্রকাশ করা হবে না। উত্তর সেভাবেই দিতে বলা হয়েছিল।
ব্ল্যাক জ্যাং জানান, এই গানটির জন্য তিনি ছয় অংকের ওপরে পারিশ্রমিক পেয়েছেন। আর ‘সাইফার বাংলা ২০১৬’-এর গায়করা পেয়েছেন তিন লাখ টাকার ওপরে।

বিষয়টি নিয়ে ভিশাল বার্তা দিলেন এভাবে, ‘পারিশ্রমিকটা আমরা মূল্যায়ন হিসেবে দেখছি। তারচেয়ে বড় বিষয় পুরনো গানের জন্য আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে অর্থ প্রদান করাটাই পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর।’

/এম/

লাইভ

টপ