এই সিনেমা শিল্প লইয়া আমরা কী করিবো

Send
কামরুজ্জামান বাবু
প্রকাশিত : ০০:২৯, জুলাই ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৫, জুলাই ২৪, ২০২০

কামরুজ্জামান বাবুসিনেমাটা শুরুই হলো মাত্র। কিন্তু গল্পটা জমে ওঠার আগেই কখন বিরতি হলো, টেরই পেলাম না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমরা ১৩ নাম্বার রিলে চলে এসেছি! কী বেরসিক পরিচালক রে বাবা...। একটু পরেই এন্ডক্লাইমেক্স। কী হবে এবার?

টান টান উত্তেজনা। দুই পক্ষ মুখোমুখি!

একদিকে ১৮টি সংগঠনের নেতারা। যার নেতৃত্বে রয়েছেন খোরশেদ আলম খসরু, মুশফিকুর রহমান গুলজার, অমিত হাসান, ওমর সানীরা প্রমুখ।
অন্য পক্ষে মিশা সওদাগর, জায়েদ খান। তাদের মাথার ওপর ছায়া রয়েছেন মিয়া ভাই খ্যাত বর্ষীয়ান অভিনেতা সংসদ সদস্য ফারুক।
আর এই সিনেমার কাস্টিং হিসেবে যদি বলা যায়, তাহলে বলতে হবে বড় চমক হচ্ছেন অতিথি চরিত্রে অনন্ত জলিল, হিরো আলম আর সেফু দা!
না, এই সিনেমাটি গতানুগতিক কোনও বাণিজ্যিক সিনেমা নয়। এখানে গৎবাঁধা কোনও পরিচালক বা নায়ক-নায়িকা নেই।
তাহলে প্রশ্ন করতে পারেন, এ আবার কেমন সিনেমা। পরিচালক নেই, নায়ক নেই, খল নায়ক নেই, নায়িকা নেই!
সবাই আছেন, কিন্তু এই সিনেমা রুপালি পর্দায় প্রদর্শন করার জন্য নয়। এটি বাস্তবের চলমান কিছু ঘটনাবলির চুম্বক অংশ মাত্র। আর এতক্ষণ এই নিয়ে আলাপনটা করছিলাম।
হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না। সারা দুনিয়া করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করছে, তার ওপর দেশের তিন ভাগের এক ভাগ অঞ্চল বন্যাকবলিত, দেশের সব সিনেমা হল বন্ধ। সিনেমা পাড়ায় শুটিং-ডাবিং নেই বললেই চলে। আর তখন কিনা নিজেরা নিজেরা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছেন। বাহ্, আমাদের বিবেক কী জাগ্রত!
মনে মনে ভাবি, এই সিনেমা শিল্প লইয়া আমরা কী করিবো? যেখানে সিনেমায় লগ্নি করার জন্য প্রযোজক আসছে না, যেখানে সিনেমা হলগুলো সহসা খোলার রাস্তা নেই, যেখানে দর্শক আর সিনেমা হলে ফিরবে কিনা তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকার কথা সবার, তখন চলছে পাল্টাপাল্টি সভা-সমাবেশ। এই শিল্পের মৃত্যুঘণ্টা কি এবার তাহলে বাজবেই? আসুন শুনি, ঘটনাটা কী নিয়ে?
চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রযোজক-পরিচালক ও অন্য কলাকুশলীদের ১৮টি সংগঠন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর-সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। দুজনের বিরুদ্ধেই ১৮টি সংগঠনের রয়েছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ১৮টি সংগঠন থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর পরপরই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে ১৮ সংগঠনের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। যদিও সেদিন সভায় শিল্পী সমিতির অনেক কার্যকরী পরিষদের সদস্যকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। এমনকি জনপ্রিয় তারকা শিল্পীদের অনেকেই ছিলেন অনুপস্থিত। তবে ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল, ডিপজল সেদিন মিশা ও জায়েদ খানের সমর্থনে বক্তব্য প্রদান করেন এবং পাল্টা শিল্পী সমিতি ১৮ সংগঠনের নেতাদের সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে দ্রুত অবাঞ্ছিত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
এখানে প্রশ্ন আসতেই পারে, এই দৃশ্যপটে অনন্ত জলিল-হিরো আলম, সেফু দা এবং ফারুক এলেন কেমন করে?
সেখানেই তো বড় চমক!
যেদিন ১৮টি সংগঠন মিশা ও জায়েদ খানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলো, সেদিন নাকি হিরো আলম সেই সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন। হিরো আলম জায়েদ খানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। আর এই ঘটনার সূত্র ধরেই পরদিন অনন্ত জলিল ঘোষণা দিলেন, হিরো আলমকে তার নতুন সিনেমা থেকে বাদ দিয়েছেন। হিরো আলমের বিরুদ্ধে অনন্তর অনেক অভিযোগের একটি ছিল, মাত্র কয়েকদিন আগে জায়েদ খানের সঙ্গে হিরো আলমের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তিনি স্থাপন করে দিয়েছিলেন। তারপরও হিরো আলম ১৮ সংগঠনের সমাবেশে জায়েদ খানের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাকে ছোট করেছেন।
হিরো আলমও কম যাননি। তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা ছেড়ে দিয়ে বললেন, অনন্ত সাহেব টাকার গরম দেখাবেন না। আমি একজন প্রযোজক হিসেবে ১৮ সংগঠনের সমাবেশে গিয়েছি এবং আমি কথা বলেছি। কিন্তু জায়েদ খান সম্পর্কে বাজে কিছু বলিনি। তারপরও যখন আপনি জায়েদের কথা বিশ্বাস করলেন, তখন তো আপনার সম্পর্কে আমার আর কী-ই বা বলার আছে। এর পরে অনন্ত জলিল সম্পর্কে তিনি আরও বেশ কিছু বিরূপ মন্তব্য করলেন।
এখানেই থেমে নেই ঘটনা। হঠাৎ করেই হালের শব্দবোমা বলে খ্যাত সেফু দা ভিডিও বার্তায় বোমা ফাটালেন হিরো আলমের পক্ষে। অশ্রাব্য ভাষায় অনন্ত জলিলকে গালমন্দ করলেন। শত থেকে হাজার কোটি টাকার মানহানির মামলা করার কথা ঘোষণা দিলেন সেফু দা।
অতিথি শিল্পীদের চমকানো যেন তখনও শেষ হয় না। এবারে অনন্ত জলিল আরও একটি ভিডিও বার্তা ছাড়লেন। তিনি নিজেকে শিক্ষিত ও প্রতি মাসে কত কোটি টাকা বেতন দিয়ে কারখানা চালান সেই বিস্তর ব্যাখ্যা দিয়ে সেফু দাকে নানা ধরনের পরামর্শ দিলেন। সেই সঙ্গে হিরো আলমেরও নানারকম প্রশ্নের উত্তর দিলেন বেশ ভদ্রভাবেই।
তারপরই আমাদের মিয়া ভাই পর্দার অন্তরাল থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি বললেন, শিল্পীর কোনও সীমানা নেই। শিল্পীকে কেউ কখনও বয়কট করতে পারেন না।
ব্যস। যেন ভিমরুলের চাকে ঢিল। পরিচালক মালেক আফসারী অপর এক ভিডিও বার্তায় বললেন, ফারুক সাহেব ঠিক বলেছেন। তাহলে যখন ফারুক আপনি চলচ্চিত্র পরিবারের নেতা ছিলেন, তখন কেন শাকিব খানকে বয়কট করেছিলেন? শাকিব কী শিল্পী নন। আর এতে যোগ দেন একে একে অমিত হাসান, ওমর সানী, রিয়াজ ও ফেরদৌস।
ঘটনাটি ছোট্ট, কিন্তু প্রতিক্রিয়া অনেক বড়। সিনেমার গল্প এগিয়ে চলে। পাঠক নিশ্চয়ই এখন বুঝতে পারছেন কেন এই সিনেমায় কোনও নায়ক-নায়িকা, ভিলেন এবং ১৫টি অভিনয়ের দৃশ্য, ৫টি গান আর ৬টি মারামারির দৃশ্য নেই।
আচ্ছা এ ঘটনা এতদূর এলো কেন?


চলচ্চিত্রের ব্যয় কমানোর জন্য চলচ্চিত্রের সব সংগঠন মিলে শিল্পীদের পারিশ্রমিক কমানোসহ প্রতিদিনকার শুটিংয়ে যাওয়া আসার জন্য ১ লাখ টাকার ওপরে যারা পারিশ্রমিক পায়, তাদের কনভেন্স বাতিল করা হয়। কিন্তু এ নিয়ে মিশা সওদাগর নাকি পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম খোকনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। অন্যদিকে জায়েদ খান ১৮ সংগঠনের এই সিদ্ধান্তকে না মানার জন্য শিল্পীদের খুদেবার্তা পাঠান।
আর এতে করে ১৮ সংগঠনের নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে মিশা সওদাগর এবং জায়েদ খানকে চলচ্চিত্র শিল্পে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। এরপরেই যোগ হয় যে মিশা ও জায়েদ খান নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ১৮৪ জন শিল্পীর সদস্যপদ বাতিল করেছেন। এই সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ১৮৪ জন সদস্য এফডিসির সামনে মানববন্ধন শুরু করে। ১৮ সংগঠন এখন সর্বশেষ মিশা ও জায়েদের পদত্যাগ দাবিতে নতুন করে সভা করেছে।
ওপরের দৃশ্যপটগুলো যখন ঘটেছে, তখন কে বলবে চলচ্চিত্র শিল্পে দুর্যোগ আছে? কে বলবে এখানে করোনা নিয়ে আমরা লড়াই করছি? কে বলবে এই দেশের সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে আছে?
একটি কথা স্পষ্ট করে বলা যায়, নাই কাজ তো খই ভাজ। এখানে যত না সিনেমা হচ্ছে, তার চেয়ে সংগঠন বেশি। এফডিসিতে শুটিং না হলেও বছরজুড়ে সংগঠনগুলোর রাজনীতি বেশ সরগরম। সিনেমা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এরা যতটা না ভাবে, তার চেয়ে নিজেদের স্বার্থ, নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তাদের যত লড়াই। আহা, প্রয়াত আব্দুল জব্বার খাঁন, শেখ নিয়ামত আলী, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, সুভাষ দত্ত, এহতেশাম, জাহাঙ্গীর খান, নায়করাজ রাজ্জাককে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে যেতে হয়নি।
প্রথমত, ১৮৪ জনের সদস্যপদ যেভাবে বাতিল করা হয়েছে, ঠিক এই প্রক্রিয়ায় আরও অনেক শিল্পীর সদস্যপদ বাতিল হওয়ার কথা। যদি সেটি মিশা ও জায়েদ খান সেসময় করতেন, তবে আজ এই প্রশ্ন আসতো না। দ্বিতীয়ত, জায়েদ খানের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক চলছে। শুরুর দিকে আজকের ১৮ সংগঠনের প্রথম সারির অনেক নেতাই জায়েদ খানকে মদদ জুগিয়েছেন। উৎসাহ দিয়ে দিয়ে আজকের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হিসেবে তৈরি করেছেন। ফলে জায়েদের কাজকর্ম নিয়ে ১৮ সংগঠনের নেতারা যেসব প্রশ্ন এখন তুলেছেন, এগুলোর দায় আপনাদের ওপরই বর্তায়।
আজ থেকে তিন বছর আগে শিল্পী সমিতির নির্বাচনের রাতে শাকিব খানকে এফডিসিতে যেভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল, সেদিন যদি প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজকের জায়েদ খান তৈরি হতো না। ফলে শুধু জায়েদ খানের বা মিশা সওদাগরের এককভাবে দোষ দেওয়া উচিত নয়। জায়েদ খানের বিরুদ্ধে আরও একটি বড় অভিযোগ, তার বড় ভাই ডিএমপিতে পুলিশের ওসি ছিলেন। তিনি পুলিশ প্রশাসনের বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে অনেককে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এমনকি তিনি রাত ১০-১১টা পর্যন্ত শিল্পী সমিতিতে বসে জুনিয়র অনেক মেয়ে শিল্পীকে নিয়ে আড্ডা জমাতেন। এগুলো প্রথম থেকে প্রশ্রয় দিয়েছেন ১৮ সংগঠনের নেতারা। এমনকি মিশা সওদাগর জেনেও না জানার ভান করেছেন। কিছু দিন আগে এফডিসি কর্তৃপক্ষ নিয়ম করেছে, রাত আটটার পরে শুটিং ছাড়া এফডিসিতে অবস্থান করা যাবে না। কিন্তু তারপরও জায়েদ খান কোনও নিয়মনীতি মানেননি। আরও বড় অভিযোগে জানা যায়, শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তিনি রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করেছেন। এটি কেমন দায়িত্বশীল আচরণ। তারপরও জায়েদ খানের ওপর নাকি ছিল বর্তমান সংসদ সদস্য ফারুকের ছায়া। ফলে জায়েদ খান তখন আর কাউকে মানবেন কেন? তখনই ১৮ সংগঠনের নেতারা বুঝতে পারলেন তাদের ভুল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। জায়েদ খান তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
এরপর জায়েদ শিল্পীদের বড় একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কারণ, জায়েদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক দুস্থ শিল্পীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। যেকোনও শিল্পীর বিপদে আপদে দাঁড়িয়েছেন। লোক দেখানো হোক বা সত্যিকার অর্থে হোক, তিনি সমিতির দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু কাজকর্ম করেছেন। যা তাকে তার যেকোনও বিতর্কিত কাজকর্ম করতে সহায়তা করেছে।
এবার আসি মিশা সওদাগর প্রসঙ্গে। মিশা সওদাগরকে অবাঞ্ছিত করার প্রক্রিয়টি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা, মিশা সওদাগরের সঙ্গে বদিউল আলম খোকনের যখন কথা কাটাকাটি হয়, সেটি ছিল করোনার অনেক আগেই। আজ থেকে প্রায় ৫ মাস আগের ঘটনাকে কেন এখন টেনে আনা হলো তা বোধগম্য নয়। এখানে বোঝাই যাচ্ছে, মিশা যেহেতু জায়েদের পক্ষ অবলম্বন করেছেন, তাই পুরনো ঘটনার জের হিসেবে তাকে টেনে আনা হয়েছে। যা মোটেই ভালো কাজ হয়নি। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, মিশা সওদাগর অসম্ভব জনপ্রিয় একজন অভিনেতা। চলচ্চিত্র শিল্পে অবাঞ্ছিত করার আগে তাকে শোকজ দেওয়া যেত। এমনকি শিল্পী সমিতির নির্বাচনে আজকের ১৮ সংগঠনের নেতা খোরশেদ আলম খসরু ছিলেন সরাসরি মিশার সমর্থক। খসরু মিশার পক্ষে কাজ করেছিলেন, এটি সবারই জানা। আজ কী এমন হলো যে হঠাৎ করেই খসরুর নেতৃত্বে মিশাকেও জায়েদ খানের সঙ্গে অবাঞ্ছিত করলেন? মনে রাখতে হবে, মিশার মতো শিল্পী তৈরি করতে বহু প্রযোজক-পরিচালককে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে। একজন মিশাকে রাতারাতি ধ্বংস করে দেওয়ার ইচ্ছাটা বন্ধ করুন চলচ্চিত্রের স্বার্থে। মিশার দোষ হলো তিনি তার সাধারণ সম্পাদককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি।
প্রশ্ন আরও এসে যায়, গত শিল্পী সমিতির নির্বাচনের আগে মৌসুমী ১৮৪ জন শিল্পীর সদস্যপদ বাতিলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। কই, তখন তো খসরু, গুলজার সাহেবদের আমরা কোনও কথা বলতে দেখিনি। সেদিন যদি প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি খসরু, পরিচালক সমিতির সভাপতি গুলজার বলতেন- না আগে ১৮৪ জন শিল্পীর সদস্যপদ ফেরত দিতে হবে, তাহলে কী মৌসুমী নির্বাচনে পরাজয়বরণ করতেন? মৌসুমীকে পরাজিত করার জন্য যত ধরনের কারিশমা অবলম্বন করা প্রয়োজন তার সবই করেছেন ১৮ সংগঠনের অনেক নেতাই। এমনকি সহকারী অনেক শিল্পীকে টাকার বিনিময়ে মৌসুমীকে ভোটদান থেকে বিরত রেখেছেন। সেসব কথা আমরা ভুলিনি। কিন্তু তাহলে আজ কেন মিত্র এতটা শত্রুতে পরিণত হলো?
অনন্ত জলিল, আপনি প্রযোজক-পরিচালক। চলচ্চিত্র শিল্পে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন। দুই হাতে দান করেছেন অসহায় মানুষদের। হিরো আলমকে আপনি আপনার সিনেমায় নায়ক করে ঘোষণা দিয়েছেন। জায়েদ খানের সঙ্গে হিরো আলমের ভুল বোঝাবুঝি ছিল। আপনি সেটিও মিটিয়ে দিয়েছেন। হিরো আলম বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, ১৮ সংগঠনের সভায় হয়তো কথা বলেছেন। তিনি যদি জায়েদ খানকে নিয়ে কোনও আপত্তিকর কথা বলেও থাকেন, সেটি তো তার গণতান্ত্রিক অধিকার। আর আপনারও গণতান্ত্রিক অধিকার রয়েছে কাউকে ছবিতে নেওয়া বা না নেওয়ার। আপনি হিরো আলমের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ করছেন। ভালো কথা। এতটুকুই যথেষ্ট ছিল তাকে সিনেমা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য। কিন্তু হিরো আলম জায়েদ খানকে নিয়ে কী বলেছেন, বা বলেননি, সেই বিষয়টিকেও সিনেমা থেকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তা আপনার কাছে প্রত্যাশিত নয়। এরপর হিরো আলম যেভাবে উত্তর দিলেন এবং সেফু দা যে বাজে ভাষায় আপনাকে আক্রমণ করলেন, তা আসলে আপনার জন্যই ভালো হয়নি। আপনি অনেক গরিব অসহায় মানুষকে দান করেন, এটি সবারই জানা। সেফু দার মতো বিকৃত রুচির মানুষের কথার উত্তর দেওয়ার জন্য সেগুলো আপনাকে কেন নিজ মুখে বলতে হবে? আপনি কত কোটি টাকা প্রতি মাসে বেতন দেন, সেটিও বলার প্রয়োজন ছিলো না সেফু দা বরাবর। সাধারণ মানুষ এগুলোকে অহঙ্কার হিসেবে দেখে।
অন্যদিকে আগেই বলেছি সেফু দা হলেন একজন বিকৃত রুচির মানুষ। তিনি বাজে শব্দ ব্যবহার করে গালমন্দ করেন মানুষকে। ২৭ বছর আগে দেশ ছেড়েছেন, আপনি কে চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে কথা বলার? আর সেফু দার বক্তব্যকে যারা শেয়ার দিয়েছেন, তারা আসলে অনন্ত জলিলকে ছোট করেননি, ছোট করেছেন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে। যে শিল্পে একসময় নির্মিত হয়েছে বেহুলা, সূর্যদীঘল বাড়ি , জীবন থেকে নেওয়া, ক খ গ ঘ ঙ, ছুটির ঘণ্টা, ভাত দে , বসুন্ধরা, আলোর মিছিল, শুভ দার মতো অসংখ্য চলচ্চিত্র।
ফারুক আমাদের সিনেমা শিল্পের অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তি। আপনি সংসদ সদস্য। আপনি এখন সবার মুরুব্বি। আপনি যখন শুনলেন, তখন কেন একপক্ষে কথা বললেন তা আমাদের কারোরই বোধগম্য নয়। আপনি বলছেন শিল্পীকে বয়কট করা যায় না। ভালো কথা, তাহলে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে আপনি যখন চলচ্চিত্র পরিবারের নেতা হলেন, তখন কিন্তু এই শাকিব খানকে আপনার নেতৃত্বেই ১৮ সংগঠন মিলে বয়কট করেছিল। তাহলে তখন কী আপনার সেই কাজটি সঠিক হয়েছিল? কি বলবেন আমাদের সবার প্রিয় মিয়া ভাই?
আসলে এখন একটি কথাই জোরেশোরে সবাই বলছেন, চলচ্চিত্র শিল্পে আসলে হচ্ছেটা কী, ঘটছেটা কী? এরা কী এই গ্রহের মানুষ নাকি ভিন গ্রহের কারও ছায়া পড়েছে তাদের ওপর?
এই ঘটনার পরে আমরা দেখলাম রিয়াজ, ফেরদৌসসহ অনেক সিনিয়র শিল্পী নানারকম মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। আপনাদেরও দায় কম নয়। আপনারা তো এই শিল্প থেকেই তৈরি হয়েছেন। আপনারা আজ যেভাবে বলছেন মিশা ও জায়েদের বিরুদ্ধে, সেদিন যখন শিল্পী সমিতির নির্বাচন হলো, তার আগে তো মৌসুমী আপনাদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন তার সঙ্গে নির্বাচন করার জন্য। আপনাদের অসহযোগিতার জন্য মৌসুমী সেদিন একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেননি। সেদিন তো নানাভাবেই পাশ কাটিয়ে গেছেন। দায় অবশ্যই নিতে হবে আপনাদের। আমাদের সিনেমার মস্তবড় নায়ক ও বিজ্ঞাপন এবং শিল্পী সমিতির পরপর দুইবারের নির্বাচিত সাবেক সভাপতি শাকিব খান কেন এখনও নীরব। সিনেমা শিল্পের এসব ঘটনা কেন আপনারা উদ্যোগ নিয়ে নিজেরাই মিটিয়ে ফেলছেন না। কেন সমস্যা জিইয়ে রেখে সিনেমা শিল্পকে হাস্যকর করে তুলছেন? আখেরে কী আপনাদের কারও লাভ হবে? নাকি শুধু শুধু লোকের কাছে হাসির পাত্র হচ্ছেন?
করোনা ক্রান্তিতে যেখানে তামাম দুনিয়ার শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, সেখানে আপনাদের ভূমিকা কী? সিনেমা হলগুলো কীভাবে খোলা যায়? কীভাবে আবার মানুষকে সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনা যায়, এ নিয়ে আপনাদের কী আদৌ কোনও পরিকল্পনা আছে? সামনে কীভাবে প্রযোজকরা টাকা বিনিয়োগ করবেন এসব নিয়ে আপনারা কী পরিকল্পনা করেছেন?
এবারে সিনেমার শেষ দৃশ্যে আসি।
আসল কথা হলো সিনেমা শিল্পে নেই ভালো অভিভাবক, নেই ভালো উদ্যোক্তা। যারা আছেন, তারা সবাই নিজ নিজ জায়গায় ক্ষমতাবান। কিন্তু মনে রাখতে হবে ক্ষমতা চিরদিন থাকে না। থাকে শুধু কর্মের স্মৃতি। আপনাদের পূর্বপুরুষ প্রযোজক-পরিচালক ও অভিনেতারা যে শিল্প আপনাদের কাছে রেখে গিয়েছিলেন, আপনারা সেই শিল্পটাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আপনাদের পরে যে প্রজন্ম আসবে, তাদের কাছে কোন সিনেমা শিল্প রেখে যাবেন? কী জবাব দেবেন তাদের কাছে?
নাকি আশঙ্কাই সত্যি হবে। সব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবে। হাতেগোনা কিছু মাল্টিপ্লেক্স থাকবে। সেখানে তখন বিদেশি সিনেমা প্রদর্শিত হবে? এছাড়া কী আর কোনও বিকল্প থাকবে?
লেখক:
অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান, নাগরিক টিভি
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ