তৃতীয় চোখযুগে যুগে তারুণ্যের ‘আইডল’ যখন হিমু ও বাকের ভাই

Send
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
প্রকাশিত : ২০:০৮, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৩, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

মাসুদ হাসান উজ্জ্বলপ্রথমেই বলে নিই এটি কোনও গবেষণামূলক প্রবন্ধ নয়। সুতরাং এখন যে লেখাটি লিখতে চলেছি সেটা আমার এক ধরনের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণামূলক তো নয়ই, কোনও বক্তব্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও নয়—স্রেফ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
হ‌ুমায়ূন আহমেদের চেয়ে জনপ্রিয় কোনও লেখক স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে যে জন্মায়নি সে কথা অনস্বীকার্য। তাঁর মৃত্যুর পরও সেই জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। সব থেকে বড় কথা, এই জনপ্রিয়তা কোনও ধর্ষক, প্রতারক, বখাটে তরুণ কিংবা টিকটক তারকার নয়। এই জনপ্রিয়তা একজন লেখকের!
তাহলে আমরা বলতেই পারি দেশে যথেষ্ট সংখ্যক সাহিত্যপ্রেমী সংবেদনশীল মানুষ রয়েছেন, ফলে এটি একটি উন্নত সংস্কৃতির সংবেদনশীল রাষ্ট্রও বটে!
তাই হ‌ুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনা করে নিজেকে উঁচুমানের সাহিত্যবোদ্ধা হিসাবে প্রমাণ করতে চাওয়া শ্রেণিকে আমার অপরিণত মনে হয়। তাদের আচরণকে আমার ছেলেমানুষি মনে হয়!
যুগে যুগে এই ব্যক্তি প্রজন্মকে প্রভাবিত করবার ক্ষমতা আমরা দেখে আসছি। তাঁকে খারিজ করতে চাওয়াকে তো ছেলেমানুষি মনে হবেই!
তবে এই সমাজে বাকের ভাই বা হিমুর প্রভাব আমার ভয়ানক লাগে! পাড়ার মাস্তানকে লেখনী এবং কল্পনাশক্তি দিয়ে যতটা মহিমান্বিত করা হয়েছে তা আমাদের সমাজকে ভালো কিছু দিয়েছে বলে আমার মনে হয় না! মাস্তান হয়ে ওঠাটা কোনও অবস্থাতেই সরল কিছু নয়। পাড়ার মাস্তান হোক আর বড়সড় গ্যাং লিডার- সবারই কোনও না কোনও রাজনৈতিক পরিচয় বা গডফাদারের ছায়ায় থাকতে হয়। এই সমস্ত মানুষ কোনও অবস্থাতেই মানবিক চরিত্রের হয়ে ওঠে না! যাকে সবাই ভয় পায়, তার ভীতিকর কর্মকাণ্ডের রেকর্ড থাকতে হয়- সে আপনি বাকের ভাই বলুন আর রবিনহুড!
বাকের ভাই আমার কিশোর বয়সের প্রিয় চরিত্র। তার  প্রভাবে বাবার পকেট থেকে টাকা চুরি করে চেইন কিনেছিলাম তর্জনীতে বেঁধে ঘুরানোর জন্য। আর ঠোঁটের কোণে মজনুর মতো টুথপিক তো ঝুলিয়ে রাখতামই। এরকম করতে করতে একসময় আমার অনেক বন্ধু বা পরিচিতজনই সেই সময়ে সিরিয়াস মাস্তানির সঙ্গে জড়িয়ে যায়! সফল চরিত্রায়নের প্রভাব বলে কথা!
আমার এক বন্ধু (নামটা না বলি) খুব ভালো ছাত্র ছিল। সে একসময় মার্ডার কেইসের আসামি হয়ে অনেক দিন জেলে ছিল। লেখাপড়া আর হয়নি, এখন যতদূর জানি সে মাস্তানি, টেন্ডারবাজি নিয়েই আছে।
হিমুর চরিত্রে স্বেচ্ছাচারিতা আর পুরুষতান্ত্রিকতা ছাড়া তেমন গভীর কোনও দার্শনিকতা আমি খুঁজে পাইনি। রুপার প্রেমকে কখনও দরকারি আবার কখনও উপেক্ষার যোগ্য দেখাতে গিয়ে রুপার আবেগকে এতটাই অবজ্ঞা করা হয়েছে যে, তাকে একজন স্বেচ্ছাচারী যুবকের খামখেয়ালিপনার ভিকটিম বা ইচ্ছাদাসী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না! একে তো বাঙালি সহজাতভাবেই অলস, জীবন এবং কর্মবিমুখ এক জাতি- একটা নেহায়েতই অকর্মণ্য, ভবঘুরে, কর্মবিমুখ চরিত্র আইডল হয়ে ওঠার ফলাফল কোনও অবস্থাতেই ইতিবাচক কিছু নয়! আর যাই হোক, হিমু কিন্তু গৌতম বুদ্ধ কিংবা কাহলিল জিবরানের প্রফেট গ্রন্থের সেই পরিব্রাজক নয়!
হ‌ুমায়ূন আহমেদ ও হিমুর প্রতিকৃতিতবে হিমুর চরিত্র আমার দৃষ্টিতে বাকের ভাই থেকে একটু বেটার। কারণ, হিমু সমাজের অনেক ভণ্ডামি বা অন্তঃসারশূন্যতাকে স্যাটায়ার করে।
আমি এখনও সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে হঠাৎ এসে সব অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে যাওয়া আদর্শবান আপাত অবাস্তব নায়ক প্রত্যাশা করি! একটু আশার আলো বাঁচিয়ে রাখা আর কী! বাস্তব পৃথিবীকে তুলে ধরার জন্য লক্ষ লক্ষ প্রতিবেদক তো রয়েছেনই, সাহিত্যিকগণ কল্পনার স্বাধীনতা নিয়ে কিছুটা আশার আলো না হয় দেখালেন! প্রতিদিন হেরে যাওয়ার এই করুণ পৃথিবীতে কেউ না কেউ পথ দেখাক!
আমি খুব ইচ্ছাকৃতভাবে খানিকটা গালি খাবার কিংবা ধিকৃত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সর্বাধিক জনপ্রিয় দুটি চরিত্র নিয়ে কথা বলে বসলাম। কারণ, আমাদের জাতিগত প্রবণতাই সম্ভবত যুগে যুগে আমাদের নায়ক ঠিক করে দিয়েছে।
শহীদ রুমি, শহীদ আজাদ বা শহীদ নূর হোসেনের মতো কোনও চরিত্র, কিংবা কোনও স্বপ্নবাজ লিটলম্যাগকর্মী বা বিজ্ঞানমনস্ক পাগলাটে কোনও ছাত্র আমাদের গল্পে নায়ক হিসাবে খুব একটা আবির্ভূত হয়নি এবং এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি কখনও। যতটা জনপ্রিয় বাকের ভাই বা হিমু!
বাকের ভাই বা হিমু কোনও বাস্তব চরিত্র নয়, লেখকের কল্পনায় বাস্তবের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠা চরিত্র।
আমার কৌতূহলী মন সবসময় জানতে চেয়েছে, চরিত্রায়নে এতটা ক্ষমতাধর স্রষ্টার হাতে সমাজকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ইতিবাচক কোনও চরিত্র সেই অর্থে কেন তৈরি বা জনপ্রিয় হলো না!
এবং সেই একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের দেশে নতুন জনপ্রিয় লেখক, নাটক-সিনেমার পরিচালক থেকে শুরু করে অনেক কিছুই তৈরি হয়েছে!
জাতিগত প্রবণতার কথা আরও একবার না বললেই নয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক উপন্যাস যখন ধারাবাহিক নাটক হিসাবে নির্মিত হয়, তখন সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে কান কাটা রমজান চরিত্রটি। অথচ সেখানে গণমানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে বারবার কারাবরণ করা মেজ ভাই চরিত্রটিও ছিল, যেটি অতটা জনপ্রিয়তা পেতে সক্ষম হয়নি।
এই দেশে আমি অন্তত কোনও ইতিবাচক চরিত্রকে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পেতে দেখিনি!
এই দায় লেখকের না পাঠকের সেই প্রশ্ন থেকেই যায়!
বাকের ভাই চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর (মাঝে)আমি এই দেশের বাস্তবতায় ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দটাকে খানিকটা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখি বৈকি! আমাদের দেশের জনপ্রিয় জিনিসপত্রের রেকর্ড খুব একটা সুবিধার নয় যে!
হ‌ুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, হ‌ুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই শেষ করি। আমি মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর গো-গ্রাসে হ‌ুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়তাম। দিনে তিনটি-চারটি উপন্যাস পড়ে ফেলার রেকর্ডও আছে আমার! আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগারের লেখক হ‌ুমায়ূন আহমেদকে। তবে এই মানের লেখা দিয়ে তিনি জনপ্রিয় হননি!
লেখক: নাট্যকার, নির্মাতা, সংগীত ও চিত্রশিল্পী

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ