ভারতের সংবিধানকেই সবচেয়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ মনে করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে এমনটাই জানালেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মোদি বলেন, আমার সরকারের জন্য সংবিধান হচ্ছে সত্যিকারের পবিত্র গ্রন্থ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পবিত্র গ্রন্থে বিশ্বাসের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার, সব নাগরিকের জন্য সমতার মতো বিষয়গুলো মৌলিক অধিকার হিসেবে সন্নিবেশিত রয়েছে।
সংবিধান রচয়িতা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ওপর মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কিন সংবিধানের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেন নরেন্দ্র মোদি। আবার গান্ধীর অহিংস নীতির প্রভাব মার্টিন লুথার কিং-এর ওপর পড়ার কথাও মার্কিন সিনেটরদের মনে করিয়ে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মূলত মোদি তার বক্তব্যে বোঝাতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সব অর্থেই ‘স্বাভাবিক মিত্র’। কারণ, দুই দেশের সম্পর্কের শিকড় রয়েছে গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো আদর্শে।
সন্ত্রাসবাদ নিয়েও কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভারতের পশ্চিম সীমান্ত থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত সন্ত্রাসের নানা নাম। যেমন লস্কর, তালেবান। মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের উচিত, যারা রাজনৈতিক লাভের জন্য সন্ত্রাসকে মদদ দেয় তাদের কড়া বার্তা দেওয়া।
২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার সময়ে ভারতের পাশে থাকার জন্য কংগ্রেসের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান মোদি। চীনের নাম উচ্চারণ না করেই মোদ বলেছেন, শক্তিশালী ভারত মার্কিন কৌশলগত স্বার্থের অনুকূল।
রাজনীতিকদের মতে, সংবিধান ও গণতন্ত্রের কথা বলে মোদি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর সরকারের ভাবমূর্তি কিছুটা সংশোধন করতে চেয়েছেন। কারণ, অসহিষ্ণুতা বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে কিছুটা ছায়া ফেলেছিল। মোদি সরকার সংখ্যালঘুদের ভরসা দিতে পারছে না বলে মন্তব্য করেছিলেন মার্কিন কংগ্রেসের কোনও কোনও সদস্য। শেষ বার ভারতে এসে বিদায়ী বক্তৃতায় পরোক্ষে অসহিষ্ণুতা নিয়ে খোঁচা দিয়েছিলেন ওবামা। এজন্যই হয়তো মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে সংবিধানকে পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নরেন্দ্র মোদি।
মার্কিন কংগ্রেসে সংবিধানকে পবিত্র গ্রন্থ বললেও মোদি’র গায়ে লেগে আছে সাম্প্রদায়িকতা আর রক্তের দাগ। তার নেতৃত্বে গুজরাটের মুসলিম নিধনযজ্ঞের কারণে ‘গুজরাটের কসাই’ নামেই পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। যার প্রতিক্রিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি।
মোদির শাসনামলে ভারতে জোরেশরে উঠেছে গরু বিতর্ক। গরুর মাংস খাওয়ার গুজবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সংঘবদ্ধ হামলায় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটেছে।
গরুর মাংস খাওয়াকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে একটা অসহিষ্ণু অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা। ঘরে গরুর মাংস রাখা হয়েছে এমন গুজবের উপর ভিত্তি করে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাক নামের একজনকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।
গরুর মাংস খাওয়ার ‘অপরাধে’ কাশ্মীরের বিধানসভার একজন সদস্যকে পার্লামেন্টের মধ্যেই অধিবেশন চলাকালে অপদস্থ করা হয়েছে। আর সেটা করেছে বিধানসভায় থাকা নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি’র সদস্যরা। ঘটনার শিকার ওই ব্যক্তির নাম ইঞ্জিনিয়ার আবদুল রশিদ শেখ। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায় তিনি একজন স্বতন্ত্র সদস্য। এখানেই শেষ নয়, এর কদিন পর, গতবছরের ১৯ অক্টোবর, ওই ব্যক্তি যখন দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বের হয়ে আসছিলেন, উগ্রপন্থি হিন্দুরা তখন তার মুখে কালি নিক্ষেপ করেন।
গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে কাশ্মীরে একজন ট্রাকচালককে হত্যা করা হয়েছে। হরিয়ানাতে ইতিমধ্যেই আইন করে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানকার বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তার রাজ্যে অন্য ধর্মের লোক থাকতে পারবে, কিন্তু কেউ গরুর মাংস খেতে পারবে না।
ভারতের একমাত্র রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যগরিষ্ঠ। সেই কাশ্মীরে এখন গো-হত্যা নিষিদ্ধি করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে গরুর মাংস খাওয়ার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু যেহেতু কাশ্মীরে গো-হত্যা নিষিদ্ধ, তাই সেখানকার মুসলমানদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনে ধর্মের চেয়েও সরকারের অযৌক্তিক বিধিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
যদি প্রশ্ন করা হয়, এই মুহূর্তে গরুর মাংস রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ কোনটি? উত্তর আসবে ভারত। এতদিন এই শীর্ষস্থানটি ছিল ব্রাজিলের দখলে। এ বছর সেটি ভারতের কব্জায় চলে গেছে। এই যে বিপুল বিফ রপ্তানি, এটা করতে কি গরুগুলোকে হত্যা করতে হয়নি? কারা করেছে সেই হত্যা? তাদের বিরুদ্ধে কি কখনো কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে ওই উগ্র হিন্দুবাদীদের? এক কথায় এসবের উত্তর না। তাহলে গরুর মাংস খাওয়ার গুজব কেন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে? এসব কেন ঘটছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এই দেশটিতে? এটি কি ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকারের অনুসৃত কোনো নীতি? এসবের অবশ্য দায় নিতে রাজি নন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উল্টো মার্কিন মুলুকে গিয়ে নিজেকে একজন অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক হিসেবেই উপস্থাপনের চেষ্টা চালালেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যার হাতে গুজরাটের মুসলিমদের রক্তের দাগ লেগে আছে বলে অভিযোগ ভারতের মুসলিম সংগঠনগুলোর। সূত্র: এনডিটিভি, আনন্দবাজার, বিবিসি।
/এমপি/








