বাংলাদেশের সঙ্গে অচিরেই তিস্তার পানি চুক্তি সম্পন্ন করার আশা প্রকাশ করেছে দিল্লি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করেছেন কেন্দ্রীয় সরকারে জেষ্ঠ্য সদস্যরা। তবে বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় এবং শেখ হাসিনার সঙ্গের সুসম্পর্কের কারণে এখন মমতা এই চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন, এমনটাই মনে করছেন তারা।
এদিকে কলকাতাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, সংসদের আসন্ন বর্ষা অধিবেশনের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাবেন। বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। আনন্দবাজার পত্রিকা নিজস্ব সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, সেই বৈঠকে তিস্তার প্রসঙ্গ গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হবে। একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে মমতার সুসম্পর্ক, অন্যদিকে তিস্তা চুক্তির বিপরীতে বিশ্বব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় মমতা নিজেও চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে যাচ্ছেন বলে আভাস দিয়েছে পত্রিকাটি।
সবমিলে বর্তমান সময়টিকেই তিস্তা চুক্তির জন্য মোক্ষম সময় বিবেচনা করছে ভারত।
গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে দু’দেশের স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরে সাক্ষী হয়েছিলেন মমতা। সেই সময়ই তিনি জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকার বাংলাদেশের বিরোধী নয়, তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে দু’দেশের চুক্তির যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, রাজ্যের স্বার্থ বিবেচনা করে তবেই এ ব্যাপারে এগোনো হবে। টাইমস অব ইন্ডয়া এবং আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, সেই ঘটনার এক বছরের মাথায় এবার তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ নিয়ে মমতার দরজায় ফের কড়া নাড়তে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
১৯ জুন রবিবার নিয়মিত বাৎসরিক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘তিস্তা নিয়ে তিন পক্ষের মতামত এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হওয়াটা জরুরি। তিনটি পক্ষ হল— বাংলাদেশ, ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন থাকায় দীর্ঘদিন মমতার সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলা যায়নি।’ সেই ব্যস্ততা মিটে যাওয়ার পরে ফের কথা শুরু করা হচ্ছে বলে জানান সুষমা। বলেন, ‘ভোটে জয়লাভ করে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসেছেন মমতা। তিনি নিজেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতার সম্পর্কও খুব ভাল। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও উনি হাসিনাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন।’ সুষমা মনে করছেন, নিজেদের মধ্যে তিস্তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করার জন্য এটাই সবচেয়ে ভাল সময়।
কলাকাতাভিত্তিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জুলাইয়ে সংসদের বর্ষা অধিবেশন চলাকালীন বা তার আগেই দিল্লি আসছেন মুখ্যমন্ত্রী। দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করার পর এই প্রথম বার তিনি বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। রাজনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, ওই বৈঠকে তিস্তা প্রসঙ্গটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই তোলা হবে। জলের বণ্টন প্রক্রিয়া আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মমতা এবার ইতিবাচক মনোভাব দেখাবেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিস্তার জল বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির মমতা যে বিরোধী নন, সে কথা আগেই চিঠি দিয়ে মোদীকে জানিয়েছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে কিছু সমাধান সূত্রের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। নিজস্ব অনুসন্ধানের বরাতে আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, আসন্ন মোদি-মমতা বৈঠকে আলোচনা হবে সেগুলির বাস্তব দিক।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষবাস তিস্তার জলের উপর নির্ভরশীল। অথচ তিস্তার জলের একটা বড় অংশ আগেই টেনে নেয় সিকিম। আনন্দবাজার নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারকে উত্তরবঙ্গে পৃথক জলাধার তৈরি করার প্রস্তাবও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রস্তাব থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, চুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাবের কারণেই তিনি সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবছেন।
উল্লেখ্য, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে তিস্তা নিয়ে যে সমাধান সূত্রটি তৈরি হয়, তাতে বলা হয়েছিল— খড়া মৌসুমে নদীতে যতটা জল থাকবে, তা সমান ভাগে ভাগাভাগি হবে দুই দেশে। যার মধ্যে আবার প্রত্যেক দেশের প্রাপ্য অংশ থেকে চার ভাগের এক ভাগ জল বরাদ্দ করা হবে নদীখাতে নাব্যতা বজায় রাখতে চার্জিং-এর জন্য। তখন মমতা এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল খড়া মরসুমে তিস্তায় কার্যত জল থাকেই না। আর বর্ষার সময় বাংলাদেশ জল পায় প্রকৃতির নিয়মেই। তাই সমস্যাটা মূলত খড়া মৌসুমেরই।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে মমতাকে ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে, তিস্তা চুক্তি করা গেলে ওই নদী সংস্কার এবং জল সরবরাহের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে বিপুল ঋণ পাওয়া যাবে। তার ফলে এখন তিস্তা প্রকল্পে উত্তরবঙ্গের যে ৫৮ হাজার হেক্টর জমিতে জল যায়, ভবিষ্যতে তার পরিমাণ ৯ লাখ হেক্টরে দাঁড়াবে। প্রতিবেদনের দাবি, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ পাওয়ার সুযোগ মমতাকে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ইতবাচক মনোভাবেন দিকে ধাবিত করেছে। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার
/বিএ/








