ফ্রান্সের নিস শহরের প্রমেনাদে দেজ অ্যাংলেইসে যখন বাস্তিল দিবস উদযাপন চলছিল, তখন আশেপাশের হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্ট থেকে আতশবাজির ঝলকানি উপভোগ করছিলেন বিদেশি পর্যটকরাও। তবে বাস্তিল দিবস উদযাপনের সেই দৃশ্য যে মুহূর্তের মধ্যে যে ভয়াবহতায় রূপ নেবে তা হয়তো কল্পনাও করেনি কেউ। হামলার কবল থেকে শিশুদের বাঁচাতে নিরাপদে ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন অভিভাবকরা। আতঙ্কিত মানুষের এদিক সেদিক ছুটোছুটি, গাড়ির নিচে চাপা পড়া মানুষের আর্তনাদ আর এখানে সেখানে মরদেহ পড়ে থাকার দৃশ্য যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শীরা।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন সেই ভয়াবহতার কথা। তারা জানান, গাড়িটি যখন ভীড়ের দিকে এগিয়ে আসছিল তখন অনেকে কিছু না বুঝেই আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াচ্ছিলেন। শিশুদের বাঁচাতে মা-বাবারা তাদেরকে বেড়ার ওপাশে ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছিলেন। ইসমালি খালিদির মতে পুলিশ যখন ওই এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যেতে বলছিল তখন তা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ছুটে আসা লোকজন বলছিল পুলিশ তাদেরকে দৌড়াতে বলেছে তাই দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কেন দৌড়াতে বলেছে তা বলেনি। আর লোকজনও কারণ জানতে না চেয়েই জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ছুটেছে।’
খালিদি আরও জানান, অনেক বাবা-মা তাদের বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখলাম এক ব্যক্তি বেষ্টনীর ওপারে বাচ্চাকে ছুড়ে মারলেন এবং পড়ে নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়লেন’।
নিস শহরে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন মার্কিন-ফিলিস্তিনি লেখক ইসমালি খালিদি। ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘আচমকা ভীড় থেকে মানুষকে ছুটে আসতে দেখলাম আমরা। কিছুক্ষণ পর আবার উল্টা পাশ থেকে ছত্রভঙ্গ মানুষ ছুটে আসতে দেখা গেল। আমি কখনও এ ধরনের বিশৃঙ্খল ও আতঙ্কের পরিস্থিতি দেখিনি। কিন্তু ঠিক কী ঘটছে তা কেউ বলতে পারছিল না’।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ছুটি কাটাতে ফ্রান্সের নিস শহরে আসেন টোনি মোলিনা। নিস শহরের একটি হোটেলে ওঠেন তিনি। আর ১৪ জুলাই (বৃহস্পতিবার) হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করে নিস শহরে ভয়াবহ ট্রাক হামলার ঘটনা। তিনি জানান, ট্রাকটি যখন ঘণ্টায় ৩০-৩৫ মাইল গতিবেগ নিয়ে ভীড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছিল আর মানুষকে চাপা দিচ্ছিল তখন নিজেকে বেশ অসহায় বলে মনে হচ্ছিল তার। টোনি বলেন, ‘জানালা দিয়ে আমি দেখলাম ১০টি মৃতদেহ পড়ে আছে।’
ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১৫ ফুট দূরত্বে অবস্থান করছিলেন আরেক মার্কিন প্রত্যক্ষদর্শী। সিএনএনকে তিনি বলেন, ‘শুরুতে মনে হচ্ছিলো এটি বোধহয় কোনও দুর্ঘটনা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে এটি ইচ্ছাকৃত হামলা।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) বাস্তিল দিবস উদযাপনের জন্য ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাইসের প্রমেনাদে দেজ অ্যাংলেইসে আতশবাজি প্রদর্শনী দেখতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। সেখানে একটি ট্রাক ওই জমায়েতের দিকে ছুটে আসে। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএম টিভি-কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রাকের ধাক্কায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ওই ট্রাকের চালক নিহত হয়েছেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি দুর্ঘটনা ছিল না। ইচ্ছাকৃতভাবেই ট্রাকটি ভিড়ের মধ্যে তুলে দেওয়া হয়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: গার্ডিয়ান, সিএনএন
/এফইউ/বিএ/








