এক ‘অন্যরকম কিউবা’য় শনিবার উদযাপিত হচ্ছে ২০ শতকের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহানায়ক ও কমিউনিস্ট শাসিত কিউবার স্থপতি, সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রোর জন্মদিন। রাজধানী হাভানার পথে পথে একটু পর পর ‘গ্রেসিয়াস, ফিদেল’ লেখা পতাকা শোভা পাচ্ছে। বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে তার উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী উক্তিগুলো। ফিদেল আর কিউবান বিপ্লবের গল্প বলে চলেছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। তারপরও এই হাভানা ফিদেলের নয়। তারপরও এই কিউবা ফিদেলের নয়।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ফিদেল ক্যাস্ত্রো দেশের অর্থনীতিকে জাতীয়করণ করেছিলেন। মার্ক্সবাদের ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ ধারণার অধীনে একাই দেশ শাসন করেন। মুনাফাকেন্দ্রিক বাজার অর্থনীতির বাইরে এসে দেশের মানুষের জন্য জনকল্যাণের নীতি নিয়েছিলেন ক্যাস্ত্রো। জনগণকে দিতে চেয়েছিলেন সামাজিক সুরক্ষা। আর তা পেরেছিলেনও তিনি। বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে তাই বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সব কিউবান নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যগত সেবা নিশ্চিত করতে সমর্থ হন তিনি।
স্বাস্থ্যগত কারণে ২০০৮ সালে আরেক বিপ্লবী নেতা ছোটভাই রাউল ক্যাস্ত্রোর (৮৫) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ফিদেল। রাউল ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে কিউবার অর্থনীতিকে ‘সোভিয়েত-ধাঁচের রক্ষণশীলতা’ থেকে বের করে এনে বাজার-ভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিবর্তন করার পথে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গের সুদীর্ঘকালের তিক্ততার বরফও গলতে শুরু করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঐতিহাসিক কিউবা সফরের পর। কমছে দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতা।
এদিকে কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলাও তাদের ‘একুশ সমাজতন্ত্রের নীতি’ থেকে সরে এসে মুক্তবাজারের পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাজার হাজার কিউবান নাগরিক এখন মুক্তবাজারে। তারা বাড়ি-গাড়ি কেনাবেচা করছে, ইন্টারনেটের বৈশ্বিক ভূবনে যোগ দিচ্ছে। এই বদলে যাওয়া কিউবায় সে দেশের নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, ক্যাস্ত্রোর নীতি আর কাজে আসছে না। বিশ্ববাজারে যুক্ত হওয়ার তাগিদ বোধ করেন তারা। অবশ্য নাগরিকদের অপর একটা অংশ ক্যাস্ত্রোর সামাজিক সুরক্ষার সমাজতান্ত্রিক নীতির পক্ষেই রয়েছেন। তারপরও এই কিউবা ফিদেলের কিউবা নেই। এ এক বদলে যাওয়া কিউবা যেখানে সামাজিক সুরক্ষা হুমকির মুখে।
বদলে যাওয়া এই কিউবাতে ক্র্যাস্ত্রোর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনও বড় মিছিল, কিংবা বড় কোনও জনসমাবেশের আয়োজন করা হয়নি। কেবল সঙ্গীত আর চিত্র প্রদর্শনীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়োজনে তাকে স্মরণ করা হচ্ছে। তার উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী উক্তিগুলো দিয়ে বিলবোর্ডগুলো সাজানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবকালীন সময়ের গল্প ও তাকে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। হাভানার বিখ্যাত হোটেল নাসিওন্যালে ক্যাস্ত্রোর ছবির প্রদর্শনী চলছে। এই প্রদর্শনী থেকে বেরিয়ে ইয়োলমিস মেনগানা নামের এক দোকান মালিক বলেছেন, ‘সমগ্র বিশ্বের জন্যই ফিদেল উদাহরণ। তিনি আমাদের দেশের জন্য যা যা করেছেন, তা তাকে এক বিশাল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।’
ফিদেলের জন্মদিনে কিউবার সবচেয়ে বড় অয়োজনটি শিশুদের নিয়ে। দেশজুড়ে শিশুদের সম্মিলিত সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সম্মানিত হবেন ‘মহান বিপ্লবী’ ফিদেল ক্যাস্ত্রো। এদিকে তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে ভেনেজুয়েলার সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো কিউবা সফরে আসছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো।
প্রসঙ্গত, ক্যাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় প্রেসিডেন্ট ফালজেন্সিও বাতিস্তা এবং কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা নিবন্ধ লিখে। তিনি এ ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। অবশেষে তিনি ১৯৫৩ সালে মনকাডা ব্যারাকে একটি ব্যর্থ আক্রমণ করেন এবং তারপর কারারুদ্ধ হন ও পরে ছাড়া পান। এরপর তিনি বাতিস্তার সরকার উৎখাতের জন্য সংঘটিত হওয়ার জন্য মেক্সিকো যান। ফিরে এসে ১৯৫৬’র ডিসেম্বরে সরকার উৎখাতে নামেন। ১৯৫৯ সালে ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে দেশটির যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একনায়ককে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে কিউবার বিপ্লবীরা। এর কিছুদিন পরই ক্যাস্ট্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হন এবং একদলীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে রূপ দেন। ১৯৭৬ সালে তিনি রাষ্ট্র ও মন্ত্রিপরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী কিউবার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট জন্ম নেওয়া ক্যাস্ত্রো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে কিউবাকে বের করে নিয়ে এসে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার নীতির কারণে দেশটির অনেকেই তাকে গভীর শ্রদ্ধা করেন। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখায় অনেকে আবার তার সমালোচকও। তবে সব কিউবানদের কাছেই তিনি প্রাণের নেতা। এমনই একজন কিউবান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, ‘হয়তো ক্যাস্ত্রোর নীতি আজ আর কাজ করছে না। হয়তো তিনি কিছু ভুলও করেছিলেন। তবে তার চিন্তা ও কর্মের মহত্ত্ব নিয়ে আমাদের মনে কোনও সন্দেহ নেই।’
/বিএ/








