কথিত শান্তি আলোচনায় আস্থাহীন কাশ্মির, মিছিল হাঁটছে স্বাধীনতার পথে

আরশাদ আলী
০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ২১:২৩আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ২৩:৫৮

কাশ্মিরে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী এক নারী রাজনীতিতে গণআন্দোলন বা বড় ধরনের বিক্ষোভের ক্ষেত্রে একটা কথা বেশ প্রচলিত আছে, ‘একটি স্ফুলিঙ্গ থেকেই দাবানল ছড়িয়ে পারে’। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের বর্তমান পরিস্থিতিতেও কথাটি বেশ মিলে যায়। একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো কাশ্মিরকে আবারও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। টানা ৫২ দিনের কারফিউ শেষেও যা অব্যাহত রয়েছে। দুই মাস ধরে চলমান বিক্ষোভ দমনে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যখন দেশটির সংসদের সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলকে পাঠিয়েছে কাশ্মিরে। বিপরীতে কাশ্মিরের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ পেয়েছে নতুন মাত্রা। একদিকে কথিত শান্তি আলোচনার প্রতি কাশ্মিরিদের আস্থাহীনতা, একই সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান ও বিক্ষোভ।

২০১০ সালের পর এমন কাশ্মির দেখেনি ভারত। একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেভাবে কাশ্মিরের রাস্তায় রাস্তায় নেমেছে মিছিল, বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠেছে। এবারের কাশ্মিরি বিক্ষোভের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, এ বিক্ষোভে সুনির্দিষ্টভাবে কোনও নেতৃত্ব ছিল না। মূলত কাশ্মিরি তরুণদের উদ্যোগেই টানা এ বিক্ষোভ চলছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর আগে কাশ্মিরিদের ক্ষোভের লক্ষ্য ভারতীয় সেনাবাহিনী থাকলেও এবারই প্রথমবারের মতো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে পুলিশ।

টানা দুই মাসের এ ব্যাপক বিক্ষোভের শুরু হয় কমান্ডার বুরহান ওয়ানিসহ তিন হিজবুল যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর।দ  ৮ জুলাই কাশ্মিরের অনন্তনাগের কোকেরনাগ এলাকায় সেনা ও পুলিশের বিশেষ বাহিনীর যৌথ অভিযানে তারা নিহত হন। এর পর কাশ্মিরজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ কাশ্মিরিদের দাবি, বুরহানকে ‘ভুয়া এনকাউন্টারে’ হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে পুলওয়ামা ও শ্রীনগরের কিছু অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়। পরবর্তীতে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে গেলে কাশ্মিরের দশটি জেলা, এমনকি দূরবর্তী গ্রামেও কারফিউ জারি করা হয়। বিক্ষোভ দেখিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন মানুষ। আর বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা জারি রাখে নিরাপত্তা বাহিনী। আর তাতে প্রাণ হারায় অন্তত ৬৭ জন। টানা ৫২ দিন পর ২৯ আগস্ট শ্রীনগরের কয়েকটি এলাকা থেকে কারফিউ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়। যদিও ১৪৪ ধারা জারি থাকে। সব মিলিয়ে ৫৮ দিনে অন্তত ৭৩ জন নিহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।

কথিত শান্তি আলোচনায় আস্থাহীন কাশ্মির, মিছিল হাঁটছে স্বাধীনতার পথে

বুরহানের মৃত্যুর ৫৪ দিন পর ফের পুলিশের গুলিতে এক তরুণের মৃত্যু হয়। কারফিউ প্রত্যাহারের ৩১ আগস্ট নাদিহাল গ্রামে ফলবাহী একটি ট্রাককে ওই অঞ্চলে প্রবেশে পুলিশ বাধা দিলে শুরু হয় সংঘর্ষ। এতে ওই তরুণ নিহতের পাশাপাশি অন্তত ১৫০ জন আহত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ ও সেনা সদস্যরা বেশ কয়েকজনকে মারধর করে এবং গ্রামের অনেকগুলো বাড়ি তছনছ করে। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হয়ে গুলি ছোড়ে।

এ পরিস্থিতিতে বিক্ষোভরত কাশ্মিরকে শান্ত করতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটির সংসদের সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলকে আলোচনার জন্য পাঠানোর জন্য সিদ্ধান্ত। রবিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল কাশ্মির পৌঁছায়। ‘শান্তি আলোচনা’-য় অংশ নিতে কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি কাশ্মিরে সক্রিয় সবগুলো দলকে আহ্বান জানান। মেহবুবা মুফতির পিডিপি দল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় থাকা বিজেপির সমর্থণ নিয়ে জম্মু-কাশ্মিরের ক্ষমতায় আছে।

শনিবার কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত হুরিয়াতকে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান মেহবুবা। রবিবার প্রতিনিধি দল পৌঁছার পর এক যৌথ বিবৃতিতে সংঘঠনটির শীর্ষ তিন নেতা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামরত হিজবুল মুজাহিদিনের নতুন প্রধান সৈয়দ সালাউদ্দিন রবিবার শুরু হওয়া ‘সর্বদলীয় শান্তি আলোচনা’কে শনিবারই নিস্ফল বলে আখ্যা দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন, তিনি কাশ্মির প্রসঙ্গে কোন রকম শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দেবেন। শনিবার তিনি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের দিয়ে কাশ্মিরে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কাশ্মিরকে ভারতীয় সেনাসদস্যদের কবরস্থানে পরিণত করারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই নেতা।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা রবিবার প্রত্যাখ্যান করলেও শনিবারই কাশ্মিরের প্রথমসারির অধিকার সংগঠন, সিভিল সোসাইটি গ্রুপ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং ডাক্তাররা ওই আলোচনা বর্জনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। শনিবার থেকেই কাশ্মিরের রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ হয় শান্তি আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে। রবিবার সকাল থেকেও মিছিল ও বিক্ষোভ চলে সমানে। শান্তি আলোচনাকে ‘লোক দেখানো’ আখ্যায়িত করে চলছে এসব বিক্ষোভ। দক্ষিণ কাশ্মিরে কার্ফিউ উপেক্ষা করে সংঘটিত বিক্ষোভে পুলিশের হামলায় আহত হয়েছেন শতাধিক। সকালে প্রতিনিধি দলের কাশ্মির সফরের সময় ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে উপত্যকা। কাশ্মিরের শোপিয়ান এবং অনন্তনাগে কারফিউ উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসে। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষে শতাধিক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বিক্ষোভের সময় মিছিলে স্লোগান উঠছে, গো ব্যাক ইন্ডিয়া, আমরা চাই স্বাধীনতা, বুরহান আমাদের হৃদয়ে জীবিত ইত্যাদি।

শোপিয়ানে মিছিল থেকে কাশ্মিরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। কেবল সেই মিছিলেই অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন বলে একজন জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন ছররা গুলির আঘাত পেয়েছেন।

বিক্ষুব্ধ কাশ্মিরে ফের সংঘর্ষ

কাশ্মিরের সংঘর্ষ সম্পর্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২৭ আগস্ট বলেছিলেন, ‘যারা প্রাণ হারাচ্ছে, ওরা আমাদেরই লোক। ওরা আমাদের তরুণ প্রজন্ম, নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য ও পুলিশ।’ ৫৭ টি মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসি জানিয়েছে, কাশ্মির সংকট সমাধান একমাত্র গণভোটেই হতে পারে। জম্মু-কাশ্মিরে ভারতের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছে সংস্থাটি।

কাশ্মিরে পাকিস্তানপন্থীদের তৎপরতা থাকলেও সেখানে সরাসরি কাশ্মিরের স্বাধীনতার দাবিতে লড়াইকারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভারতের দাবি, কাশ্মিরে যারা লড়াই করছেন তারা আসলে জঙ্গি। বিচ্ছিন্নতাবাদী। কাশ্মির প্রশ্নে সমগ্র ভারতীয় স্টাবলিশমেন্টের দৃষ্টিভঙ্গিতেই সেখানকার সমস্যাকে ‘বিচ্ছিন্নতা আর জঙ্গিবাদের’ সমস্যা আকারে দেখা হয়ে থাকে। বিপরীতে কাশ্মিরিদের কাছে সেখানকার লড়াই আদতে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই।

 বুকারজয়ী বিখ্যাত ভারতীয় লেখক অরুন্ধতি রায় স্পষ্ট করে বলেছেন,কাশ্মিরে আসলে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন চলছে। অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে কাশ্মিরবাসীকে। কাশ্মির সমস্যার একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, নিউ ইয়র্ক টাইমস।

/এএ/

সম্পর্কিত
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতা কে এই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও যেভাবে বিরোধীদলীয় নেতা হলেন ঋতব্রত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম