স্বায়ত্তশাসনের পক্ষেই রায় দিয়েছে হংকং। আইন পরিষদ নির্বাচনে জয় পেয়েছে এক নতুন প্রজন্ম। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, বিজয়ীরা চীনের শাসনের পরিবর্তে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে।
রবিবারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে। ভোট পড়েছে ৫৮ শতাংশ। ভোটার অংশগ্রহণের পরিমাণ ২০০৮ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। ৯০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ডেমোসিস্টো পার্টির ল’ আইন পরিষদের আসন নিশ্চিত করেছেন।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন ২০১৪ সালে স্বাধীনতাপন্থি আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাথান ল। তিনি ২০১৪ সালে সংঘটিত আমব্রেলা আন্দোলনে সামনের কাতারের নেত্বৃত্বে ছিলেন তিনি। ভোটে স্বাধীনতাপন্থি ইয়ংস্পিরেশন দলের আরও দুই সদস্য জয়ের কাছাকাছি আছেন। এরাও ২০১৪ সালের ‘আমব্রেলা আন্দোলনে’ সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্য হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তরের পর থেকে মৌলিক আইন সম্বলিত চীনের অধীনস্ত একটি সংবিধান রয়েছে দেশটির। যার মাধ্যমে কিছু সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ৫০ বছর ধরে চলা চীনের ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ওই সংবিধান। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের এক ম্যাগাজিনে এ বছরন মার্চে ‘আমাদের ২০৪৭’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৪৭ সালের মধ্যে জাতিসংঘ হংকংকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেবে, একইসঙ্গে সেখানে একটি গণতান্ত্রিক সরকার থাকবে এবং তার নিজস্ব সংবিধান থাকবে। ওই প্রতিবেদনে হংকংয়ের স্থানীয় সরকারকে বেইজিংয়ের পুতুল বলেও উল্লেখ করা হয়। কমিউনিস্টশাসিত চীন হংকংকে নিয়ন্ত্রণ করলেও সেখানে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বলবৎ; হংকংয়ের কারণেই চীনে ‘এক দেশ দুই নীতি’ পদ্ধতি চালু আছে।
আমব্রেলা নামের ওই আন্দোলনে হংকং-এর সংবিধান পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছিল, যেন চীনের বলয় থেকে খানিকটা বের হয়ে আসা যায়। আন্দোলনের সময় বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক রাজধানী হংকং কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। চীন আন্দোলনকারীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং ওই আন্দোলনের স্বীকৃতি দেয়নি।
হংকংয়ের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ যাবতীয় বিষয়ে চীন ‘মাত্রাতিরিক্ত নাক গলাচ্ছে’ বলে অভিযোগ তুলেছিল আন্দোলনকারীরা। তারা তখন বলেছিলেন, চীনের ওই একগুঁয়েমির কারণে ‘এক দেশ দুই নীতি’ পদ্ধতি হুমকির মধ্যে পড়ছে। তবে বেইজিং বারংবার তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, দুই ধরনেরর শাসনব্যবস্থা অটুট রাখার। ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতিতে হংকং কিছু মৌলিক স্বাধীনতা ভোগ করে।
২০১০ সালে পাস হওয়া সংবিধান অনুযায়ী ৭০ আসনের হংকংয়ের আইন পরিষদের ৩৫ আসনে ভোটারদের সরাসরি ভোটে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল পদ্ধতিতে ভোট হয়। এই পরিষদের আইন প্রণয়ন এবং আঞ্চলিক বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে। তবে ওই ৭০ বিধানসভা আসনের মধ্যে ৩৫ টিতে সরাসরি ৩.৮ মিলিয়ন রেজিস্টার্ড ভোটারদের ভোটে প্রার্থী নির্বাচিত হন। অন্য ৩০টি আসন ‘কার্যকরী বিধানসভা’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এগুলো সুর্নিদিষ্ট পেশা ও বাণিজ্যের মানুষজনের জন্য সংরক্ষিত। এই আসনগুলো ৬ শতাংশ মানুষের জন্য বরাদ্দ যারা চীনপন্থী। আর বাকি যে ৫ টি বিধানসভা আসন, সেইসব আসনে কেবল সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেন। এই আসনগুলো সুপারসিট হিসেবে বিবেচিত হয়।
আইন পরিষদে চীনা আধিপত্যই শেষ নয়। হংকংয়ের প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা চীনের মনোনীত হয়ে থাকেন। আইন পরিষদের ভোট এ মনোনয়নে তেমন প্রভাব ফেলে না। সেকারণে চীনবিরোধী তরুণদের নিরঙ্কুশ জয়ের পরও বেইজিংয়ের কর্তৃত্ব বলয় থেকে বের হতে পারছে না হংকং। তবে আইন পরিষদের এ ভোটে ল’র জয় হংকংয়ের চীনপন্থী দলগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে হংকংয়ের তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখছেন। দেখছেন আত্মসত্তার লড়াই হিসেবে। তবে ভোটে স্বাধীনতাপন্থিদের ভোট বাড়ায় তা চীনপন্থী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সিওয়াই লিউং এর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসার সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভোটের পুরো ফল সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ পাওয়া যাবে।
/বিএ/








