ভারতের কানপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৫জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত দুই শতাধিক মানুষের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়েছে। জানানো হয়েছে উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার খবর।
স্থানীয় সময় রবিবার ভোর ৩টার দিকে পুখরাইয়ার কাছে ইন্দোর থেকে পাটনাগামী ভারতীয় রেলের ১৯৩২১ এক্সপ্রেস ট্রেনটির ১৪টি বগি লাইনচ্যুত হলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার কবলে পড়ার সময় ভিড়ে ঠাসা ট্রেনটির বেশির ভাগ যাত্রীই ছিলেন গভীর ঘুমে। দুর্ঘটনায় ওই ট্রেনের অন্তত ১৪টা কামরা একেবারে দুমড়েমুচড়ে যায়।
অধিকাংশ যাত্রী ঘুমন্ত থাকায় অনেকেই আটকা পড়েন দুর্ঘটনার কবলে পড়া ১৪ বগির ভেতরে। হতাহতদের উদ্ধারে রাতভর সেখানে কাজ করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। সোমবার সকালে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযান সমাপ্ত করেছে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত বাহিনী।
এদিকে কানপুরে ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘ভারতের উত্তর প্রদেশে ট্রেন দুর্ঘটনায় বহু মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ এবং আমার পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করছি। আমরা শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য প্রার্থনা করছি।’
রবিবার দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন ভারতের রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। আহতদের বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রবিবার হিন্দুস্থান টাইমস-এর খবরে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর ৯০ সদস্য দুর্ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। উদ্ধার তৎপরতা ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন তারা। দুর্ঘটনাস্থলে ৪ সামরিক ডাক্তার, ২০ প্যারামেডিকস এবং ২টি অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর কথাও জানিয়েছিলেন হিন্দুস্থান টাইমস।
ট্রেনটি যখন উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসি স্টেশন ছাড়িয়ে কানপুরের দিকে তীব্র গতিতে ছুটছিল, তখনই হঠাৎ ট্রেনের প্রায় সবগুলো কামরা লাইন থেকে ছিটকে যায়। রবিবার বিকেল ৪টার মধ্যেই দুমড়ানো বগিগুলোর মধ্যে থেকে শতাধিক মৃতদেহ বের করা সম্ভব হয়।
দুর্ঘটনার ব্যাপ্তি এতটাই বড় ছিল যে রেল প্রশাসন এবং উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সরকারের পক্ষেও পরিস্থিতি পুরোপুরি সামলানো সম্ভব নয় - সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় এদিন সকালেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানান, সরকার ভারতের ন্যাশনাল ডিজেস্টার রেসপন্স ফোর্সের তিনটি ইউনিটকে ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার নির্দেশ দেয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘বারাণসী, গাজিয়াবাদ ও দিল্লি থেকে এনডিআরএফ-এর তিনটি দল সেখানে পৌঁছে গেছে - বাহিনীর মহাপরিচালককেও আমি বলেছি ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে। ঘটনাটা খুবই বিরাট - নিহতদের সকলের পরিবারকে আমি সমবেদনা জানাই। এই দুর্ঘটনার তদন্ত অবশ্যই হবে - যতদূর জানি সেই নির্দেশও জারি হয়ে গেছে।’
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নিহতদের পরিবারকে ৫ লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি গুরুতর আহতদের ৫০ হাজার ও অল্প আহতদের ২৫ হাজার রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। মধ্য প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের জন্য ২ লাখ, গুরুতর আহতদের ৫০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছেন।
ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীও ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছেন। রেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে সাড়ে তিন লাখ ও গুরুতর আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে দেওয়া হবে। আহতদের দ্রুত কাছের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সড়কে গ্রিন করিডোর গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে জরুরি হেল্প লাইন। ওই রুটের সব ট্রেনকে বিকল্প পথে চলার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুও ইতিমধ্যে টুইট করে জানান, 'এই দুর্ঘটনার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' রবিবার দুর্ঘটনার খবর পেয়েই ছুটে যান তিনি। রেল নিরাপত্তা কমিশনারের (উত্তরাঞ্চল) নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেন । নির্দেশমতোই, কাজে নেমে পড়েন তদন্তকারীরা। প্রাথমিকভাবে রেললাইনে চিড় ধরার ফলেই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং লাইনের বিভিন্ন ফিটিংয়ের অপর্যাপ্ত জোগানের ফলেই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার পর ভারতের রেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান মোদি। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব টুইটে নিকটবর্তী রাজ্যকে উদ্ধার কাজে সহযোগিতার আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। রেলমন্ত্রী রবিবার জানিয়েছে, এ ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি করা হয়েছে। উত্তর-মধ্য রেলের জেনারেল ম্যানেজার অরুণ সাক্সেনা সংবাদমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে রেল-সুরক্ষা কমিশনারকে। লাইনের অবস্থা কেমন তা বুঝতে, কানপুর-ঝাঁসি রুটের পুরো লাইনের ভিডিও তোলা হয়েছে। তদন্তকারীরা প্রাথমিক ভাবে দুর্ঘটনার নেপথ্যে রেলপথে চিড় ধরাসহ যাবতীয় অবহেলা ও উদাসীনতাকে দায়ী করা হয়েছে।
/বিএ/








