তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে মস্কো। এ খুনের ঘটনায় ইস্তানবুলে উচ্চপর্যায়ের তদন্তকারী দল পাঠাচ্ছে রাশিয়া। এ দলের সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তুরস্কের তদন্ত টিমের সঙ্গে একযোগে কাজ করবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দফতর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ দুই দেশের একযোগে তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কাঠামোর মধ্যে থেকে তুরস্কের সঙ্গে কাজ করবেন রাশিয়ার তদন্তকারীরা। রুশ তদন্তকারীদের সংখ্যা হবে ১৮।
এদিকে আন্দ্রেই কারলভ-এর খুনের ঘটনায় এরইমধ্যে ছয় ব্যক্তিকে আটক করেছে তুরস্ক। আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, আটককৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ২২ বছর বয়সী খুনি মেভলুট মার্ট আলটিনটাস-এর মা, বাবা, বোন এবং অন্য দুই স্বজন রয়েছেন। এছাড়া খুনি আঙ্কারার ফ্ল্যাটে যে ব্যক্তির সঙ্গে থাকতেন (ফ্ল্যাটমেট) তাকেও আটক করা হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডে রাশিয়ার জবাব হবে ভয়াবহ। রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্ককে নস্যাৎ করে দিতে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। সিরিয়া সঙ্কট সমাধানে ইরান ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে মস্কো যে উদ্যোগ নিয়েছে তাকে বানচাল করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। এমন হত্যাকাণ্ডের একটিই জবাব হতে পারে। আর তা হচ্ছে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই জোরালো করা। শত্রুরা শিগগিরই সেটা টের পাবে।
বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার দূতাবাসগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারেরও নির্দেশ দিয়েছেন ভ্লাদিমিরি পুতিন।
খুনির নেপথ্য নির্দেশদাতাকে খুঁজে বেরতে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিন ও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি’র প্রধান আলেকজান্দার বর্টনিকোভকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিনষ্ট করার লক্ষ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এটা একটা উস্কানিমূলক কাজ, যার উদ্দেশ্য দুই দেশের সহযোগিতায় সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। যারা তুরস্ক-রাশিয়ার সুসম্পর্ক বিনষ্ট করতে চাইছেন তাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে না।
এর আগে তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ নিহতের ঘটনায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান। সোমবার সন্ধ্যায় একটি আর্ট গ্যালারি পরিদর্শনের সময় অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন আন্দ্রেই কারলভ। এ হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুতিনকে ফোন করেন এরদোয়ান। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক এবং তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির খবরে দুই নেতার কথোপকথনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফোনে রুশ প্রেসিডেন্টকে এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অবহিত করেন রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান।
স্পুটনিকের খবরে বলা হয়, এ হত্যাকাণ্ডকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করছেন রাশিয়ার কর্মকর্তারা।
ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কিভাবে তাকে গুলি করে হত্যার পর চিৎকার করতে থাকে খুনি।
‘তুর্কিদের চোখে রাশিয়া’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় কারলভকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। কারলভকে গুলির পর গ্যালারিতে বন্দুকযুদ্ধ চলে কিছুক্ষণ। হামলাকারী ছিল স্যুট পরিহিত সুদর্শন এক যুবক। সে হাতে রিভলবার নিয়ে চিৎকার করতে থাকে। বলতে থাকে ‘আল্লাহ আকবর’; ‘আলেপ্পোর কথা ভুলে যেও না’।
হামলায় আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সিরিয়ায় রুশ সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তুরস্কে বিক্ষোভের একদিন পরই এ হামলার ঘটনা ঘটল। হামলায় আহত আরও তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেমান সয়লু।
সিএনএন তুর্কিকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলাকারী একাই ছিল। হামলাকারীকে ‘আমি এখান থেকে জীবিত ফিরব না’ বলতে শুনেছেন তিনি। রাষ্ট্রদূতকে গুলি করার পর হামলাকারী সিরিয়ার আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে হামলাকারীর মৃত্যু হয়েছে। হামলাকারী রুশ রাষ্ট্রদূতকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালিয়েছে।
বিবিসির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পুলিশের পরিচয়পত্র দেখিয়ে হামলাকারী গ্যালারিতে প্রবেশ করে বলে শোনা যাচ্ছে।
নিহত আন্দ্রেই কারলভ ২০১৩ সাল থেকে তুরস্কে রুশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি।
/এমপি/








