সিআইএর গোপন নথি

ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের মার্কিন সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা

বিদেশ ডেস্ক
০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৭:১২আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৭:১৪
image

ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের মার্কিন সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে জঙ্গিবাদ বিস্তৃতির আশঙ্কা করছেন সিআইএ’র বিশ্লেষকরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো ওই কেন্দ্রীয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক গোপন নথি থেকে এ কথা জানতে পেরেছে। ওই নথিতে সিআইএ বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ব্রাদার হুড নিষিদ্ধ হলে মিশরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চরমপন্থী মতাদর্শে মদদ এবং মিশরে  বৈদেশিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরির মতো ভয়াবহ ভূমিকা নিতে পারে। ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে মুসলিম দুনিয়াকে।

তবে এ ব্যাপারে হোয়াইট হাউস কিংবা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কোনও প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। সিআইএ নিজেও এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের খবরে ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের পরিকল্পনার খবর জানানো হয়। ওই দুই সংবাদমাধ্যম জানায়, এ ব্যাপারে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; এমন প্রাক্তন ও বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে থেকে ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরেছেন তারা। 

রয়টার্স এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর খবরে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এবং মুখ্য পরিকল্পনা প্রণয়নকারী স্টিভ ব্যানন মনে করেন, 'আধুনিক জঙ্গিবাদের ভিত্তিভূমি' আখ্যা দিয়েছেন। নিষিদ্ধ করতে বলেছেন সংগঠনটিকে।  খবরে বলা হয়, সংক্ষিপ্ত ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সিআইএ। হোয়াইট হাউসের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে ব্রাদারহুডের ওপর নিষেধাজ্ঞা-পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাই সংক্রান্ত এক নথি অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশ করেছে সিআইএ। পলিটিকো জানিয়েছে, একজন মার্কিন কর্মকর্তাই ওই  সংক্ষিপ্ত গোয়েন্দা ভাষ্যের অনুলিপি তুলে দিয়েছেন তাদের হাতে। ওই নথি থেকে জানা যায়,  ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করতে গিয়ে ব্যাপক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। সিআইএ’র বিশ্লেষকরা ওই  সংক্ষিপ্ত গোয়েন্দা ভাষ্যে এই আশঙ্কার কথা বলেছেন।

ওই সংক্ষিপ্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশিত হয় ৩১ জানুয়ারি। এতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্য রয়েছে। সংগঠনটি তাদের নীতিগত জায়গায় সহিংসতা পরিহারের সিদ্ধান্ত নিয়োছে। আল কায়েদা এবং আইএস-এর মতো সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান রয়েছে ব্রাদারহুদের।  স্বীকার করা হয়, ‘ব্রাদারহুড সদস্যদের খুব ছোট একটা অংশ সহিংসতায় জড়িত। এরা প্রায়শই কঠোর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং বেসামরিক সংঘাতের ব্যাপারে কথা বলে।’

জর্দান, কুয়েত, মরক্কো, তিউনিশিয়ার মতো দেশগুলোতে ব্রাদ্রারহুডের শাখা আছে। তবে তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন সিআইএর বিশ্লেষকরা। ওই সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে তারা আশঙ্কা জানান, ব্রাদারহুড নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত মিশরের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। চরমপন্থার মতাদর্শকে মদদ জোগাবে, বৈদেশিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করবে, এবং মুসলিম দুনিয়াকে ক্ষুব্ধ করে তুলবে।

ওই নথিতে বলা হয়েছে, ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ বিশ্বজুড়ে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করেছে। পূর্ব-উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল, আরবীয়দের একাংশ, এবং বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের একটা বড় অংশের মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ে ইতিবাচক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে ইসলামী ধারায় আইএস-আলকায়েদা বিরোধী অবস্থান দুর্বল হবে। এতে সস্ত্রাসী সংগঠনগুলো আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী চরমপন্থায় উদ্ধুব্ধ করতে পারবে মানুষকে। 

ব্রাদারহুডের পথ চলা শুরু ১৯২৮ সালের মার্চ মাসে। সুয়েজ খাল তীরবর্তী শহর ইসমাইলিয়ায় তরুণ হাসানুল বান্নার নেতৃত্বে সংগঠনটি গড়ে ওঠে। শুরুতে 'ইখওয়ানুল মুসলিমিন' নামে এর যাত্রা শুরু হয়। সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে মিসরের প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমি আন-নুকরাশি মুসলিম ব্রাদারহুডকে বিলুপ্ত করার নির্দেশ জারি করেন। পরের বছরের ডিসেম্বরে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্না সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হন। ১৯৫৪ সালে আরব জাতীয়তাবাদী নেতা গামাল আবদুন-নাসেরের বিপ্লবের প্রতি মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থন জানায়। কিন্তু মতপার্থক্য ও অবিশ্বাসের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে খুব দ্রুতই ভাঙন সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নাসেরের শাসনামলে হাজার হাজার ব্রাদারহুড নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার হয়।

আনোয়ার সাদাত ১৯৭১ সালে মিসরের ক্ষমতায় এলে তার সরকারের সঙ্গেও তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে ব্রাদারহুডের। পরবর্তী সময়ে আনোয়ার সাদাত মুসলিম ব্রাদারহুড নেতাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে দলটির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকে। আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ১৯৭৯ সালে আনোয়ার সাদাত ইসরাইলের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করলে তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় ব্রাদারহুড। তাই ১৯৮১ সালে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলার সময় টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই তরুণ সেনা কর্মকর্তা খালিদ ইস্তাম্বুলি প্রেসিডেন্ট সাদাতকে গুলি করে হত্যা ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি। ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে ব্রাদারহুড সরকারের স্বীকৃতি পায় ১৯৮৪ সালে এসে। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পরই ব্রাদারহুড রাজনৈতিক স্বীকৃতি পায়।

২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করলে এর বিরোধিতা করে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সংগঠনটি। আর আস্তে আস্তে মিসরের রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রপ্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এক পর্যায়ে দেশটির সবচেয়ে পুরাতন এবং বড় বিরোধী দলে পরিণত হয় ব্রাদারহুড। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রাণের এই সংগঠন মিসরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন আদায় করে নিতে সমর্থ হয়। বিভিন্ন দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই নানা ধরনের সংগঠন পরিচালনা বাড়তে থাকে ব্রাদারহুডের নামে।

এতো কিছুর পরও ২০১০ সাল পর্যন্ত মিসরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে অন্য ইসলামিক দলের সঙ্গে ব্রাদারহুডও নিষিদ্ধই ছিল। তবে ২০১২ সালের ডিসেম্বরেই তারা সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে আধিপত্য বিস্তার করে। ২০১৩ সালে ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দায়িত্ব গ্রহণের পর মিসরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ব্যাপক দমন-পীড়ন ও ধরপাকড় শুরু করেন। 

/বিএ/

সম্পর্কিত
মার্কিন সেনা হত্যা করলে যুদ্ধবিরতি শেষ, উপদেষ্টাদের জানালেন ট্রাম্প
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা: মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাস
সর্বশেষ খবর
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম