প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। খনিজ ও জ্বালানি বিষয়ক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপলাইন নির্মাণ বন্ধ করে এলএনজি ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছে।
২০১৮ সাল থেকেই এলএনজি গ্যাসের ব্যবহার শুরুর বিষয়ে আশাবাদী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। দুই বছরের মাথায় ২০২০ সালে দেশে এই গ্যাসের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৮০ লাখ টনের মতো। এজন্য তিনটি নতুন আমদানি প্রকল্পের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুদের পরিমাণ কমে গেছে। তাই ২০২১ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ২৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করতে বিশ্ববাজারে সস্তা ও প্রচুর পরিমাণ গ্যাসের বাজার খুঁজছে বাংলাদেশ। এ কারণে এলএনজিতে প্রচুর বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ভাসমান সংরক্ষাণাগার ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) আগামী বছর থেকে কার্গো আমদানি শুরু করতে যাচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে মহেশখালী দ্বীপে ভাসমান সংরক্ষাণাগার এবং রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আগামী বছর এলএনজি আমদানিকারকদের ক্লাবে যোগ দিতে চায় বাংলাদেশ।
চলতি বছরের জুলাইয়ে কাতারভিত্তিক রাসগ্যাসের সঙ্গে পেট্রোবাংলা প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে আড়াই মেট্রিক টন হিসেবে ১৫ বছর ধরে এই আমদানি চলবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদার অর্ধেক পূরণ হবে।
উড ম্যাকেঞ্জির প্রতিবেদন অনুযায়ী— এ চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সরবরাহ ঘাটতি খানিকটা কমবে। তবে তা এলএনজি’র লক্ষ্যপূরণের চেয়ে অনেক কম। অন্যদিকে চলতি বছর সব খাতে যখন গ্যাসের মূল্য দুই দফায় বেড়েছে তখনও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্য দেখা যাচ্ছে কম। ফলে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত উভয় কাজে এলএনজির ব্যবহার আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এই মুহূর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য কমিয়ে যৌক্তিক করার কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এই পরিস্থিতিগুলো বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানির দিকে ধাবিত করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত তিনটি আমদানি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মোট ধারণক্ষমতা বছরে ১৭ মেট্রিক টন বাড়বে। প্রকল্পগুলো সামিট পাওয়ার, রিলায়েন্স পাওয়ার ও পেট্রোনেটের মতো বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছে।
বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ রয়টার্সকে জানান, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ দৈনিক আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করতে পারে। এ হারে বার্ষিক এলএনজি আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে। সরকার দুটি এফএসআরইউ নিয়ে কাজ করছে। আগামী বছরের জুলাই নাগাদ এখান থেকে গ্যাসের প্রবাহ শুরু হবে।
দুটি এফএসআরইউ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী দ্বীপে অবস্থান করবে। যৌথভাবে দুটি ইউনিটের বছরে সাড়ে ৭ মিলিয়ন টন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে। আরও দুটি এফএসআরইউ মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অবশ্য এজন্য নির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ভারতের পেট্রোনেটের সঙ্গে গত বছর ডিসেম্বরে প্রাথমিক একটি চুক্তি করেছে। কুতুবদিয়া দ্বীপে বছরে আরও সাড়ে ৭ মিলিয়ন টন এলএনজি রিগ্যাসিফাই করতে একটি টার্মিনাল স্থাপন নিয়ে চুক্তিটি করা হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৯০০ মিলিয়ন ডলার।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী রয়টার্সকে আরও বলেন, ‘জাতীয় চাহিদার কথা মাথায় রেখে ২০২৫ সাল নাগাদ যে কোনও জায়গা থেকে আমরা ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করতে পারবো। ওই আমদানি পরিকল্পনায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে ২০২০ দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বছরে ৫০ মিলিয়ন ও ৩০ মিলিয়ন টন এলএনজি কেনার বিষয়টি যুক্ত হতে পারে।’
নসরুল হামিদ জানান, কাতারের রাসগ্যাস ও ইন্দোনেশিয়ার পের্টামিনার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির জন্য আলোচনা করছে বাংলাদেশ। মুক্ত বাণিজ্যের আওতাভুক্ত স্পট মার্কেট থেকে ভবিষ্যৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানিরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি ও স্পট মার্কেটের সমন্বয়ে কাজটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
/এফইউ/এএ/জেএইচ/








