জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতির প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের ইন্তিফাদা বা সর্বাত্মক প্রতিরোধ অব্যাহত রয়েছে। আজ ২৮ ডিসেম্বর এই ইন্তিফাদার ২০ তম দিন। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ট্রাম্পের ওই স্বীকৃতির ঘোষণার পরই এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন ফিলিস্তিনিরা। ৮ ডিসেম্বর শুক্রবার থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইন্তিফাদা বা সর্বাত্মক প্রতিরোধের ডাক দেয় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নারী ও শিশুসহ গ্রেফতার করা হয়েছে ৬২০ জনকে। এমনকি ছোট শিশুদের ধরে নিয়ে খাঁচায় বন্দি করে রাখার মতো বর্বরোচিত ঘটনার ফুটেজও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত রয়েছে।
প্যালেস্টাইনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব (পিপিসি)-এর হিসাবে, ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে গ্রেফতারকৃত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ১২ জন নারী এবং ১৭০টি শিশুও রয়েছে। এছাড়া আহত অবস্থায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের বেশিরভাগকেই রাতের অন্ধকারে সামরিক অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের একটা বড় অংশই ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভে শামিল হতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর ধরপাকড়ের শিকার হয়েছেন। এই ধরপাকড় থেকে মুক্তি পাননি বিদেশিরাও। আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে তুরস্কের তিন নাগরিককে তুলে নিয়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। পরে অবশ্য দুজনকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ধরপাকড়ের মধ্যেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই রাজপথে নামছেন ফিলিস্তিনিরা। আওয়াজ তুলছেন নিজেদের স্বাধিকারের দাবিতে। জেরুজালেম, গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীরের রামাল্লা, হেবরন, বেথলেহেম, নাবলুস, কালকিলিয়া, তুলকার্ম ও জেনিনের রাস্তায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান তুলছেন তারা। বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলে পড়ছে ইসরায়েলি বাহিনী। তবে এতে দমে যাননি মুক্তিকামী মানুষেরা। প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন তারা। ট্রাম্প আর নেতানিয়াহু’র ছবি পুড়িয়ে, আমেরিকা-ইসরায়েলের পতাকা জ্বালিয়ে দিয়ে স্লোগান তুলছেন, ফিলিস্তিনিদের রাজধানী নির্ধারণের অধিকার আমেরিকাকে কেউ দেয়নি। আর হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, ইসরায়েল নামে কোনও দেশ নেই। তাই এর কোনও রাজধানীও থাকতে পারে না।
উল্লেখ্য, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো জেরুজালেম। ১৯৮০ সালে জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করেছিল ইসরায়েল। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর সমর্থন দেয়নি। আর ফিলিস্তিনিরা চায় দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম যেন তাদের রাজধানী হয়। এ কারণে সেখানে কোনও দেশ দূতাবাস স্থাপন করেনি। সবগুলো দূতাবাসই তেল আবিবে অবস্থিত। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির বাইরে গিয়ে গত ৬ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর থেকেই বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। আর ফিলিস্তিনে শুরু হয়েছে তীব্র বিক্ষোভ। সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাস।
হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, ফিলিস্তিনি জনগণ বিশেষ করে পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) শহরকে সুরক্ষা দিতেই হামাসের জন্ম। এই পবিত্র শহর নিয়ে মার্কিন ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় দুনিয়াজুড়ে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে তা ফিলিস্তিনি জাতির জন্য একটি বিরাট বিজয়। দুনিয়ার সব মুক্তিকামী মানুষ এ বিষয়ে আমাদের পাশে রয়েছে।
হামাসকে নিয়ে অবশ্য ইসরায়েল-আমেরিকার বাইরে সৌদি জোটেরও অস্বস্তি রয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে হামাসকে সমর্থন দেওয়ার জন্য কাতারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর জবাবে কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু আরব দেশগুলোর কাছে হামাস একটি বৈধ প্রতিরোধ আন্দোলন। আমরা হামাসকে সমর্থন করি না। আমরা ফিলিস্তিনি জনগণকে সমর্থন করি।’
প্রথম ইন্তিফাদার (গণজাগরণ) সময় থেকেই পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের প্রতিরোধ জারি রয়েছে। প্রথম ইন্তিফাদার সময়ে হামাসের প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘ইসরায়েলকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করাটাই সংগঠনের মূল তবে ফিলিস্তিনি জনতার জাতিসত্তার বোধ জাতিরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা জোরালো করে তুলতে শুরু করার পর, সেই পরিস্থিতির সমান্তরালে বদলে যেতে থাকে হামাস। মূলত দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা আল আকসা ইন্তিফাদার সময়কালে (২০০০–২০০৫) হামাসের রাজনীতিতে এক বিশেষ রূপান্তর ঘটতে শুরু করে। এ সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যায় ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন।








