জন্ম থার মরুভূমির প্রান্তিক দলিত কৃষক পরিবারে। বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে কেটেছে শৈশবের ৩টি বছর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনিও দাসত্ব করেছেন এক ভূস্বামীর অধীনে। পুলিশের অভিযানে সেখান থেকে মুক্তি মেলে তার। ১৬ বছর বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। তবে দাম্পত্যে বিসর্জিত করেননি নিজের জীবন-চেতনা। সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন একদিন। এরপর যোগ দেন রাজনীতিতে। আজ কৃষ্ণা কুমারি কোহলি নামের সেই নারী পাকিস্তানের উচ্চ কক্ষ সিনেটের সদস্য। প্রান্তিক নারীদের জন্য সোচ্চার থাকার পাশাপাশি নানা ধরনের সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত তিনি।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিন্ধু প্রদেশের নাগরপুর জেলায় জন্ম কৃষ্ণার। পিতা দরিদ্র কৃষক জুগনো কোহলি। বাবা-মা আদর করে কৃষ্ণাকে ডাকতেন ‘কিশু বাই’। কৃষ্ণার শৈশবেই বাবা জুগনো তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাড়ি জমান ওমরকোট জেলায়। এক ভূস্বামীর কাছে বন্দক দেন নিজেরসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের শ্রম। সে সময় ক্লাস থ্রি পড়ুয়াকে কৃষ্ণাকে কাটাতে হয়েছিল জেলখানার মতো পরিবেশে। পুলিশি অভিযানে ওই ভূস্বামীর খামারবাড়ি থেকে মুক্তি মেলে কৃষ্ণার।
কৃষ্ণা আর তার ভাইকে উমেরকটের তালহি গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করে দেন তার বাবা-মা। অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও তারা তাদের পড়াশোনা বন্ধ করেননি । পাকিস্তানের জিও নিউজকে কৃষ্ণা বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুত ছিল না কেরোসিনের আলোর নিচে বসে পড়তে হতো।’ ১৬ বছর বয়সে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে সিন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লালচাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। কৃষ্ণা বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে আমার স্বামী ও শ্বশুর ছিল খুবই সহযোগিতাপ্রবণ। তারা আমাকে সবসময়ই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে উৎসাহ যুগিয়েছেন।’ ২০১৩ সালে সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। এরপরেই নিজের ভাইয়ের সঙ্গে পাকিস্তান পিপলস পার্টিতে (পিপিপি) যোগ দেন। তবে ২০০৫ সাল থেকেই সমাজ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরে তার ভাই বার্নাও ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
থার মরুভূমিসহ বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক সম্প্রদায়ের নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন কৃষ্ণা। তার ফলেই মেলে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সিনেট নির্বাচনের টিকিট। আর শনিবার পাকিস্তানের আইন প্রণেতাদের ভোটে সংসদের উচ্চ কক্ষে নির্বাচিত হন তিনি। বংশ-পরম্পরায় কৃষ্ণা বীর স্বাধীনতা সংগ্রামী রুপলো কোহলির উত্তরসূরী । উপনিবেশিক ব্রিটিশ বাহিনী ১৮৫৭ সালে সিন্ধুর নগরপার্কার আক্রমণ করলে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ধরা পড়েন রুপলো কোহলি। ১৮৫৮ সালের ২২ আগস্ট তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে কৃষ্ণা জিও নিউজকে বলেন, ‘আমি শুধু থার নয় বরং দেশের সব নারীদের অধিকারের কথা বলতে প্রতিনিধিত্ব করছি। নারী অধিকার রক্ষায় অনেক আইনের খসড়া তৈরি হয় কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় না- অনেক কিছুর মধ্যে এই বিষয়টিতে পরিবর্তন আনতে চাই আমি। থারের মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বাল্য বিবাহ আর জোর করে ধর্মান্তরিত করার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা দরকার।
শনিবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের ১০৪টি আসনের মধ্যে ৫২ আসনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) পেয়েছে ১৫টি আসন, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পেয়েছে ১২টি আসন। ক্রিকেটার ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পেয়েছে ছয়টি আসন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-এফ পেয়েছে দুইটি আসন। মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পেয়েছে দুইটি আসন। ১০টি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।








