জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি বসবাসের অধিকার কেড়ে নিতে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করেছে ইসরায়েল। বুধবার (৭ মার্চ) পাসকৃত আইন অনুযায়ী কোনও ফিলিস্তিনি ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে অস্বীকার করলেই তার জেরুজালেমে বসবাস নিষিদ্ধ করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে মিথ্যা তথ্য প্রদান ও অপরাধকর্মে জড়িত থাকার বিবেচনাতেও ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে প্রণীত আইনের মধ্য দিয়ে। আইনটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্বিচারি ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তথ্যের সত্যমিথ্যা কিংবা অপরাধ-নিরপরাধ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বিবেচিত হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, আইনটিকে ‘চরম বর্ণবাদী’ আখ্যা দিয়েছে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)।
ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ৪ লাখ ২০ হাজার ফিলিস্তিনির বসবাস। পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে ইসরায়েল দাবি করে আসলেও সেখানে জন্ম নেওয়া এবং বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব নেই। শহরটিতে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ‘পারমানেন্ট রেসিডেন্সি’ আইডি কার্ড এবং অস্থায়ীভাবে জর্ডানের পাসপোর্ট দেওয়া আছে। তাদের সঙ্গে বিদেশি অভিবাসীদের মতো আচরণ করা হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও গত ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ নিয়ে এখনও বিশ্বজুড়ে সমালোচনা চলছে। আর তার মধ্যেই এবার জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ রেখে নতুন আইন পাস করেছে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট।
আল জাজিরা জানায়, নতুন আইনের আওতায় ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকার না করলে যেকোনও ফিলিস্তিনির জেরুজালেমে বসবাসের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে ইসরায়েলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশপাশি মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ কাউকে মিথ্যা তথ্যদাতা কিংবা অপরাধকর্মে জড়িত মনে করলেই পাসকৃত আইন অনুযায়ী তার বসবাসের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই এক্ষত্রে চূড়ান্ত বিবেচিত হবে। ইসরায়েলি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিয়ে দেরি টুইটারে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, এ আইনের আওতায় ইসরায়েলিদের ‘নিরাপত্তার সুরক্ষা’ দিতে পারবেন তিনি।
প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) এর জ্যেষ্ঠ সদস্য হানান আশরাবি নতুন আইনটি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে একে ‘আইনের চরম বর্ণবাদী নজির’ বলে উল্লেখ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অধিকার অনৈতিকভাবে কেড়ে নেওয়া এবং নিজেদের শহরে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের অধিকার-বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল সরকার আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানবিকতাবিষয়ক আইনের লঙ্ঘন করছে তারা।’
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অধিকার বাতিল করার ‘যুদ্ধাপরাধের শামিল’ হতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চুক্তির আওতায় তা ‘যুদ্ধাপরাধের শালি হতে পারে’ বলে উল্লেখ করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৯০ এর দশকের শুরু থেকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় শান্তি আলোচনা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা চায় পশ্চিম তীরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে এর রাজধানী বানাতে। ১৯৬৭ সালের আরব যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে রেখেছে। পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের অবিভাজ্য রাজধানী বলে দাবি করে থাকে ইসরায়েল। অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পূর্ব জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১শরও বেশি বসতি স্থাপন করেছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এ বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হলেও ইসরায়েল তা মানতে চায় না।







