ঐতিহাসিক আন্তঃকোরীয় আলোচনার পর এ সপ্তাহেই উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। চীনা পররাষ্ট্র দফতরের বিবৃতিকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবার তিনি উত্তর কোরিয়া সফরে যাবেন।
গত ২৭ এপ্রিল উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠক হয়। এদিন প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন কিম। একদিনের ওই সম্মেলনে দুই নেতা ‘একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড একেবারে বন্ধ করার’ ব্যাপারে সম্মত হন। কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও একমত হন তারা। আনুষ্ঠানিকভাবে কোরীয় যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান কিম ও মুন।
আন্তঃকোরীয় আলোচনার দুইদিন পর সোমবার (৩০ এপ্রিল) বেইজিং কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, উত্তর কোরিয়া সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সপ্তাহের বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবার এ সফর হতে পারে বলেও জানানো হয়।
চীন উত্তর কোরিয়ার একমাত্র অর্থনৈতিক মিত্র হলেও অনেক বছর উচ্চ পর্যায়ের কোনও চীনা কর্মকর্তা পিয়ংইয়ং যাননি। গত মার্চে কিম আচমকা চীন সফর করেছিলেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার নেতা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের পর এটিই ছিল উনের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিকে ৫০ এর দশকে ৩ বছরের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দুই কোরিয়া। ভূমির মালিকানাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ১৯৫০ সালের জুন মাসে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণে আক্রমণ করে বসে। যুদ্ধে চীন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তরের পক্ষ নেয়। যুক্তরাষ্ট্র ছিল দক্ষিণের পক্ষে। ৫৩ সালে এক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সংঘর্ষের অবসান হয়। তবে ৩ বছরে অন্তত ২৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা উত্তর কোরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার ওপর ৯ দফা নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব পাস করে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত। কয়েক বছর ধরে এ নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হলো।
২০০৬ সালে প্রাথমিকভাবে জাতিসংঘ যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তা ছিল ভারি অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ,ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং বিলাসবহুল মালামাল। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতা বিস্তৃত হয়। এ সময়ের মধ্যে উত্তর কোরিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়, লোহা, কৃষিজাত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরীয় নাগরিকদের বিতাড়িত করারও দাবি জানানো হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর কোরিয়ার ৫০ জাহাজ ও সামুদ্রিক পরিবহন কোম্পানির ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন এই অবরোধকে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশল বলে অভিহিত করেন। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মিত্র দেশ চীনও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সম্মতি দেওয়ায় চাপের মুখে পড়ে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার মোট বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি চীনের সঙ্গে হয়ে থাকে। অতীতে দেখা গেছে, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা যখন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ভোট দিতো তখন তাতে চীন খুব কমই সমর্থন দিতো। কিন্তু গত বছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পক্ষে সম্মতি দেয় চীন।
আন্তঃকোরীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও জোরালো হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই রবিবার (২৯ এপ্রিল) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, কিম মুনকে জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া মে মাসে পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেবে।








